আহসান এইচ মনসুর কেন ব্যাংকের গ্রাহকদের ‘শত্রু’ হলেন

· Prothom Alo

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে যেভাবে অপসারণ করা হয়েছে, তা নিয়ে চরম সমালোচনা তৈরি হয়েছে। অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতের সংকট ও অনিশ্চয়তা কাটাতে তিনি কী করেছেন বা কী করেননি অর্থাৎ তাঁর সাফল্য ও ব্যর্থতার বিষয়টি নিয়েও পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা চলছে।

Visit chickenroadslot.lat for more information.

অর্থনীতিবিদদের কাছে তিনি প্রশংসনীয় হলেও ব্যাংকের সাধারণ গ্রাহকদের কাছে তিনি সমালোচিত। তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাংকের গ্রাহকদের বড় অভিযোগ, তাঁর কারণে তাঁরা ব্যাংক থেকে তাঁদের আমানত তুলতে পারছিলেন না। আহসান এইচ মনসুরই তাঁদের টাকা আটকে দিয়েছেন। বিষয়টি কেমন? আসুন দেখা যাক।

বাংলাদেশের আইন অনুসারে প্রথাগত ব্যাংকগুলোকে তাদের কাছে রক্ষিত মোট আমানতের ১৭% (১৩% সিকিউরিটি, ৪% ক্যাশ) এবং ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোকে তাদের কাছে রক্ষিত আমানতের ৯.৫% (৫.৫% সিকিউরিটি, ৪% ক্যাশ) অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখতে হয়। সিকিউরিটি ডিপোজিট বাদে প্রতিটি ব্যাংককে তাদের কাছে রক্ষিত আমানতের ৪% টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান চলতি হিসাবে (প্রিন্সিপাল অ্যাকাউন্ট) রাখতে হবে। এটার পোশাকি নাম সিআরআর (ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও)।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন গভর্নরের দায়িত্ব নিলেন আহসান এইচ মনসুর। তিনি দেখলেন বাংলাদেশের অনেকগুলো ব্যাংক কার্যত দেউলিয়া, আমানতের দায় পরিশোধের সামর্থ্য নেই তাদের। কয়েকটি ব্যাংকের চলতি হিসাবে এই সিআরআরের টাকা জমা নেই! উল্টো তাদের প্রধান চলতি হিসাবে নেগেটিভ ব্যালান্স!

কয়েকটি ব্যাংকের ক্ষেত্রে বিষয়টি কেমন দেখা যাক। ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংকের ১০,৬১১ কোটি টাকা ঘাটতি। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ৭,১২৮ কোটি টাকা ঘাটতি। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৪,৪৮১ কোটি টাকা ঘাটতি। ন্যাশনাল ব্যাংকে ৩,৪৭৯ কোটি টাকা ঘাটতি। ইউনিয়ন ব্যাংকের ঘাটতি ২,৭৯৪ কোটি টাকা। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ৭১২ কোটি টাকা ঘাটতি। বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ৩৯২ কোটি টাকা ঘাটতি।

এর মানে ৭ ব্যাংক মিলে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ২৯,৫৯৭ কোটি টাকা বিধিবহির্ভূতভাবে তুলে নিয়ে গেছে। এ ছাড়া দুটি ব্যাংকের পর্যাপ্ত সিআরআর নেই। অথচ এই সব ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে অন্তত তাদের মোট আমানতের ৪% টাকা থাকার কথা। অর্থাৎ এই ব্যাংকগুলোর লোকজন নিজেদের ব্যাংক লুট করা শেষে বাংলাদেশ ব্যাংক লুট করা শুরু করেছে।

নতুন গভর্নর কী করতে পারতেন, কী পারেননি

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হলেন দেশের অর্থনীতির অভিভাবক। আপনি যদি এই দায়িত্ব পাওয়ার পর এই অবস্থা দেখতেন, তাহলে কী করতেন? ব্যাংকগুলোকে পরদিন সকালে আরও টাকা নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিতেন? পরদিন সকালে ব্যাংকগুলো টাকা না পেলে তারা তাদের গ্রাহককে তাদের আমানতের টাকা ফেরত দিতে পারবে না।

গ্রাহকের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হবে, দেশজুড়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর অনাস্থা তৈরি হবে, এটিও আপনি জানেন। এই উভয় সংকটে আপনি কী করতেন? আরও টাকা দিলে হয়তো অস্থিরতা তৈরি হতো না। তবে তাতে সংকট আরও ঘনীভূত হতো।

বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও কয়েক লাখ কোটি টাকা ছাপতে হতো। দেশে অতিমূল্যস্ফীতি হতো। ডলারের বিপরীতে টাকার দাম আরও কমত। বিদেশে বাংলাদেশের ক্রেডিট রেটিং কমত। বিদেশি ব্যাংক বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর ক্রেডিট লাইন বন্ধ করে দিত। আর টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিলে সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে যেত।

আহসান এইচ মনসুর টাকা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
সাত ব্যাংক যে অনৈতিক সুবিধা নিচ্ছিল, সেটা বন্ধ করে দেওয়া হয় ১৩ আগস্ট, ২০২৪। এতে সমস্যা বেশ কিছুটা হয়েছে। এসব ব্যাংকের লাখ লাখ আমানতকারী অভূতপূর্ব সমস্যায় পড়েছেন। কিন্তু বেঁচে গেছে দেশের অর্থনীতি, আরও বড় সমস্যায় পড়া থেকে বেঁচে গেছে বাংলাদেশ।

সবচেয়ে বড় যেই কাজ করেছেন, সেটা হলো ব্যাংকগুলো যেসব মন্দ ঋণ লুকিয়ে রেখেছিল, সেগুলো প্রকাশ করতে বাধ্য করেছেন। দেশের মোট খেলাপি ঋণ ৩ লাখ কোটি থেকে ৭ লাখ কোটিতে পৌঁছেছে। অনেকে এটাকে ওনার ব্যর্থতা বলে। আমি বলি, এটা ওনার সবচেয়ে বড় সাফল্য।

পরবর্তীকালে এসব ব্যাংককে টাকা না দেওয়ার সিদ্ধান্তে স্থির থাকতে পারেননি গভর্নর। নানা মহলের চাপে, জনরোষের ভয়ে তাঁকে এই সব রুগ্‌ণ ব্যাংককে ধাপে ধাপে টাকা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হয়েছে। কিন্তু সেটা অনুচিত হয়েছে। উচিত কী হতো? দায়িত্ব নিয়েই এই ব্যাংকগুলোকে বন্ধ ঘোষণা করা দরকার ছিল। ছয় মাস পর এগুলোকে কোনো একটা সরকারি ব্যাংকের সঙ্গে মার্জ করে তারপর আবার জনগণের আমানত ফেরত দেওয়া শুরু করতে হতো। সরকারি ব্যাংকে আমানত সুরক্ষিত বিধায় আমানত তুলে ফেলার চাপও এতে থাকত না।

আহসান এইচ মনসুর সেটা পারেননি; কারণ, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বল সরকার। এই সরকারের কোনো রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ছিল না। সবকিছুর সঙ্গে সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণ ছিল না।

আর কী করা উচিত ছিল? দরকার ছিল এই সাত ব্যাংকের দুর্নীতিপরায়ণ পরিচালকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া। তাঁদের সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা। দরকার ছিল এই সাত ব্যাংকের সব ঋণখেলাপিকে জেলে পোরা। তাঁদের সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা। এর সঙ্গে সঙ্গে দরকার ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যেসব কর্মকর্তা এসব ব্যাংকের সিআরআরের টাকা তুলে নেওয়ার অনুমোদন দিয়েছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।

দুর্বল সরকার এর কিছুই পারেনি। অবশ্য কিছু বাস্তবতাও ছিল। কাজগুলো খুব সহজ হতো—সেটা মনে করার কারণ নেই। আবার অসাধ্যও ছিল না।

একজন অর্থমন্ত্রী ও গভর্নর কখন ভালো, কেন খারাপ

লুকানো মন্দ ঋণ প্রকাশ করা ভালো নাকি মন্দ হলো

আহসান এইচ মনসুর সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও অনেক করেছেন। এই ব্যাংকগুলোর চলতি হিসাবে ঘাটতি কমিয়েছেন। ব্যাংকগুলোতে লুটপাট থামিয়েছেন। সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ কমিয়েছেন। দেশের বৈদেশিক দেনা পরিশোধ করেছেন। ডলারের বিপরীতে টাকার মান ধরে রেখেছেন। রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে উদ্যোগ নিয়ে সফল হয়েছেন। রিজার্ভ বাড়িয়েছেন। আইএমএফ থেকে লোনের কিস্তি এনেছেন। ব্যাংকিং খাতে কিছু সংস্কারে হাত দিয়েছেন।

সবচেয়ে বড় যেই কাজ করেছেন, সেটা হলো ব্যাংকগুলো যেসব মন্দ ঋণ লুকিয়ে রেখেছিল, সেগুলো প্রকাশ করতে বাধ্য করেছেন। দেশের মোট খেলাপি ঋণ ৩ লাখ কোটি থেকে ৭ লাখ কোটিতে পৌঁছেছে। অনেকে এটাকে ওনার ব্যর্থতা বলে। আমি বলি, এটা ওনার সবচেয়ে বড় সাফল্য।

২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন মারফত জানা যায়: ইউনিয়ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৯৬.৬৪%। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৯৬.২০ শতাংশ। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৯৫.৭০%। পদ্মা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৯৪.১৭%। আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৯১.৩৮%। এবি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৮৪.০৪%। ন্যাশনাল ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৭৫.৪৬%। জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৭৩.১৮%। বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৭১.১১%। বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৭০.৫৯%। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৭০.১৭%। আইএফআইসি ব্যাংকের খেলাপির হার ৬০.৬৩%। ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৫৮.২৪%। এক্সিম ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৫৬.৮৬%।

ইউনিয়ন ব্যাংকের মোট বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ কমবেশি ২৭ হাজার কোটি টাকা। এর প্রায় পুরোটাই খেলাপি। ব্যাংকটিতে আমানত ছিল ২৪ হাজার কোটি টাকা। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের মোট বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ কমবেশি ৬০ হাজার কোটি টাকা। এর প্রায় পুরোটাই খেলাপি। ব্যাংকটিতে আমানত ছিল ৪৫ হাজার কোটি টাকা। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের মোট বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ কমবেশি ১৩ হাজার কোটি টাকা। এর প্রায় পুরোটাই খেলাপি। ব্যাংকটিতে আমানত ছিল ১৩ হাজার কোটি টাকা। এই তিন ব্যাংকের সব টাকাই নিয়ে গেছেন এস আলম। এই ব্যাংকগুলোর কোনো ঋণ ফেরত আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে হলে আমার-আপনার ট্যাক্সের টাকা থেকেই দিতে হবে।

তলাবিহীন ঝুড়িতে টাকা ঢেলে কুলানো যায়?

৫ আগস্টের পর সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোয় সরকার ধাপে ধাপে হাজার হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এসব টাকা লুট হয়ে যাওয়া ব্যাংকগুলোকে ঋণ হিসেবে দিয়েছে। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পেয়েছে ৫,৫০০ কোটি টাকা। এক্সিম ব্যাংক পেয়েছে ৫,০০০ কোটি টাকা। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক পেয়েছে ৪,০০০ কোটি টাকা। ন্যাশনাল ব্যাংক পেয়েছে ৪,০০০ কোটি টাকা। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক পেয়েছে ২,০০০ কোটি টাকা। ইউনিয়ন ব্যাংক পেয়েছে ২,০০০ কোটি টাকা
এসব ঋণ শোধ করার কোনো ক্যাপাসিটি কোনো ব্যাংকের নেই।

যত দিন যাবে, এই ব্যাংকগুলোয় আরও টাকা দিতে হবে। ব্ল্যাকহোলের মতো এই ব্যাংকগুলো শুধু লোকসানই করবে। এসব ব্যাংকের গ্রাহকদের আস্থা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। এমন নয় যে এসব ব্যাংকের গ্রাহকদের সব আমানতের টাকা এখনই ফেরত নেওয়া দরকার। আমানতকারীরা এসব ব্যাংক থেকে টাকাপয়সা তুলে অন্য ব্যাংকে রাখবেন, কিন্তু প্রথম সুযোগেই এসব ব্যাংক থেকে টাকা তুলে ফেলবেন, সেটা নিশ্চিত।

এই ব্যাংকগুলো টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারকে এদের কাছে রক্ষিত আমানতের প্রায় সব টাকাই ছেপে এদের দিতে হবে। পাশাপাশি এসব ব্যাংক চালানোর বিপুল পরিচালন ব্যয়ের বোঝাও বইতে হবে।

তলাবিহীন ঝুড়িতে টাকা ঢেলে কুলানো যাবে না। তাই গভর্নর ৫টি ব্যাংক একীভূতকরণের উদ্যোগ নেন।

এমন অপমানজনক অপসারণ কি গভর্নরের প্রাপ্য ছিল

বিনিয়োগকারীরা কেন অসন্তুষ্ট হলেন

ব্যাংক একীভূতকরণের উদ্যোগের সুফল পাওয়া খুব কঠিন। কিন্তু এই উদ্যোগ না নিলে দিন দিন পরিস্থিতি খারাপ বই ভালো হতো না। পাঁচটি ব্যাংক বিলুপ্ত করে একটি সরকারি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে মানুষের আস্থা কিছুটা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন গভর্নর। কিন্তু আমার মতে এই উদ্যোগ নেওয়ার দরকার ছিল ব্যাংকগুলোয় তারল্য সহায়তা দেওয়ার আগে।

সব উদ্যোগেরই সুফল-কুফল থাকে। পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি থাকে। গভর্নর চেষ্টাটা অন্তত করেছেন। এই সব ব্যাংকের শেয়ার নিবন্ধিত ছিল স্টক এক্সচেঞ্জে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ ছিল শেয়ারগুলোতে। ব্যাংক মার্জ করার উদ্যোগে শেয়ারবাজারে এসব শেয়ারের লেনদেন স্থগিত করা হয়। ৫ ব্যাংকের মোট পরিশোধিত মূলধন ছিল ৫,৮১৯.৫৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ধারণকৃত শেয়ারের বুক ভ্যালু ছিল ২,২০৬.০৭ কোটি টাকা।

সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ২২০ কোটি শেয়ার বাজেয়াপ্ত করা হয়। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বাজেয়াপ্ত না করলেও হতো। নবগঠিত ব্যাংকে কোনো একটা ফর্মুলা বানিয়ে তাঁদের শেয়ার দেওয়া যেত। কিন্তু মনে রাখতে হবে, শেয়ারহোল্ডাররা হলেন কোম্পানির রেসিজুয়াল ক্লেইম্যান্ট। অন্য সব পাওনাদারের দেনা মিটিয়ে যদি কিছু থাকে, তাহলেই শেয়ারহোল্ডাররা পাবেন, নয়তো নয়।

ক্ষতি করে গেছেন এস আলম এবং অন্য লুটেরা গোষ্ঠী। এখন দেশের অর্থনীতি বাঁচাতে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে গভর্নরকে। অসন্তোষের দায় তো তাঁকে নিতে হবেই। সামওয়ান হ্যাড টু ডু দ্য ডার্টি ওয়ার্ক।

লুট হয়ে যায় লিজিং কোম্পানিগুলোও

লুট হয়ে যাওয়া নয়টি লিজিং কোম্পানি অবসায়নের উদ্যোগ নেন মনসুর সাহেব। ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্রি লুট করার আগে লিজিং ইন্ডাস্ট্রি লুট করে হাত মকশো করেছিল লুটেরা। বাংলাদেশের প্রায় সব লিজিং কোম্পানিই (কয়েকটি বাদে) লুট করে ফাঁকা করে রেখে গেছে লুটেরারা। এগুলোর ব্যবসা চালিয়ে নিতে হলে সরকারকে নানাবিধ ঝামেলা পোহাতে হতো। তাই লিজিং কোম্পানির অবসায়নই সবচেয়ে ভালো বিকল্প ছিল।

বাংলাদেশের ব্যাংক লুট করে বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়েছে লুটেরারা। সেই সম্পদ এই দেশের, সেগুলো ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনা খুব কঠিন; প্রায় অসম্ভব। অসম্ভব জেনেও এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়েছেন গভর্নর। কঠিনেরে ভালোবেসেছেন। বিদেশে উকিল নিয়োগ করেছেন, বিদেশি সরকারের সঙ্গে নেগোসিয়েশন করার চেষ্টা করেছেন, দৌড়ঝাঁপ করেছেন।

মনসুর সাহেব যে ভুল করেছেন

সফল মানুষেরা জনপ্রিয় হন কম। কারণ, সঠিক কাজটি করতে হলে আপনাকে কাউকে না কাউকে অসন্তুষ্ট করতে হবে; কারও না কারও লেজে পা দিতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় মনসুর সাহেব অনেক শত্রু জুটিয়েছেন! উনি যা করেছেন, সবই কি ঠিক ছিল? না, উনি একটা বড় ভুল করেছেন—অনেক বেশি কথা বলেছেন।

একজন গভর্নর যা বলার বলবেন মুখপাত্রের মাধ্যমে। নিজে খুব কমই সরাসরি সংবাদমাধ্যমের সামনে আসবেন। কিন্তু সেটি তিনি সামলাতে পারেননি। নানা ধরনের বক্তব্য তাঁকে নিয়ে সমালোচনা তৈরি করেছে। কথা বলার লোভ উনি সংবরণ করতে পারেননি।

তারপরও আমি মনসুর সাহেবকে সফল হিসেবেই মনে রাখব। এ রকম একজন গভর্নর একটা বিদায় সংবর্ধনা পেলেন না—এই আক্ষেপ আমি আজীবন পুষে রাখব মনের গহিন কোনো কোণে।

  • চন্দন আজিজ ব্যাংক কর্মকর্তা। ব্যাংকিং খাত নিয়ে নিয়মিত লেখালিখি করেন

    *মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source