কানা সাইদ
· Prothom Alo

মানিকহাটে তখন হাইস্কুল ছিল না। এই কথাটা বলতে গেলে আগে বলতে হয়, মানিকহাটে তখন অনেক কিছুই ছিল না। বিদ্যুৎ ছিল না, পাকা রাস্তা ছিল না, সন্ধ্যার পর আলো ছিল না। ছিল শুধু মাঠ, নদী, গাজনার বিল আর মানুষের দীর্ঘশ্বাস, যেটা রাতের বেলা বাতাসে মিশে এক অদ্ভুত আলোছায়া তৈরি করত; অভাবের ঘ্রাণ, তবু মানুষ বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখত।
গ্রামের ছেলেমেয়েদের পড়তে হলে যেতে হতো সাতবাড়িয়া। পায়ে হেঁটে দুই ঘণ্টা; বৃষ্টি হলে আরেকটু বেশি। পথের মাঝে পড়ে গেলে সারা শরীরে কাদা মেখে যেত; সরু আলের ওপর দিয়ে একজন করে পার হতে হয়, ভুল পা পড়লে কাদায় হাঁটু ডোবে। এই দৃশ্যপট গ্রামের। কুবাদ সেই পথ ভালো করে চিনত। সেই পথই যেন তার বেঁচে থাকার একমাত্র ভরসা। গ্রামের মানুষের মমতায় সে আর গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী হতে পারেনি। ৭ মার্চের ভাষণ তাকে অনুপ্রাণিত করেছিল।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
মাধ্যমিক শেষ করে কলেজে যাওয়ার কথা তার। কিন্তু বাড়িতে অন্য হাওয়া। বাবা বললেন, ‘আর পড়াশোনা না। সংসারের হাল ধর।’ মেয়েও দেখা শুরু করেছিল পরিবার। মেয়েগুলো মন্দ নয়। কিন্তু কুবাদের বুকের ভেতরে যে অস্থিরতা; সেটা বিয়ের জন্য না, তার ভাবনা সবার আগে দেশ। তার কিছুদিন পর দেশে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল।
সেদিন মানিকহাট থেকে কুবাদ একাই গেল যুদ্ধে। সে বছর তার আর বিয়ে করা হলো না। পাবনা থেকে নদীপথে, পাংশা, তারপর আবার নৌকায় কুষ্টিয়া। কুষ্টিয়া থেকে পায়ে হেঁটে প্রায় সত্তর মাইল—কলকাতার বর্ডার পার হতে হবে।
শহর থেকে খবর আসতে দুদিন লেগে যেত। খবর আসত মুখে মুখে, নৌকার মাঝির কাছে, বাজার থেকে ফেরা মানুষের চোখের কোণে। সেই চোখ দেখলেই বোঝা যেত—সে কিছু একটা দেখে এসেছে, যেটা বলা যাচ্ছে না, কিন্তু ভোলাও যাচ্ছে না।
লুডুর বাবার একটা রেডিও ছিল। ছোট্ট, কালো, অ্যান্টেনাটা বাঁকা। সেই রেডিওতে কান পেতে রাতের পর রাত বসে থাকত মানুষ।
লুডুর বাবা তখনকার জজ সাহেব। সমীহের পাত্র। মাথায় টুপি, পায়ে চটি, মুখে সব সময় একটা গাম্ভীর্য। কিন্তু সেই গাম্ভীর্যের আড়ালে কী লুকিয়েছিল, সেটা কুবাদ কোনো দিন পুরোপুরি বুঝতে পারেনি। শুধু একটা কথা তার মনে হতো, জজ সাহেব সব জানেন। শহর থেকে খবর আসার আগেই তিনি জানেন। কীভাবে জানেন—সেটা কেউ জিজ্ঞেস করেনি, তিনিও বলেননি।
কুবাদ একদিন লুডুকে বলল, ‘চল।’ লুডু বুঝল কোথায়।
অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলল, ‘বাবা আমাকে তোর সঙ্গে যেতে দেবে না।’
‘তোর বাবাকে না বলে যাবি।’
‘তুই বুঝিস না কুবাদ, আমার বাবা...’ লুডু থেমে গেল। কথাটা শেষ করল না। কুবাদ আর জোর করল না। কিছু মানুষকে ভয় থেকে টেনে বের করা যায় না। মানুষ মরে যাবার আগেই মরে গেলে, তাকে নিয়ে যুদ্ধ করা যায় না। দেশপ্রেমই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।
কিন্তু সেই রাতে লুডু তাকে একা ডেকে নিয়ে গেল মাঠের ধারে। ফিসফিস করে বলল কয়েকটা নাম। কোথায় গেলে সাহায্য পাবে, কে নিরাপদ, এত তথ্য লুডুর কাছে কোথা থেকে এল—কুবাদ জিজ্ঞেস করল না।
কিছু সময় প্রশ্ন করতে নেই। অনেক কিছু বুঝে নিতে হয়।
সেদিন মানিকহাট থেকে কুবাদ একাই গেল যুদ্ধে। সে বছর তার আর বিয়ে করা হলো না।
পাবনা থেকে নদীপথে, পাংশা, তারপর আবার নৌকায় কুষ্টিয়া। কুষ্টিয়া থেকে পায়ে হেঁটে প্রায় সত্তর মাইল—কলকাতার বর্ডার পার হতে হবে।
পথে সঙ্গী জুটল কয়েকজন। কেউ কৃষকের ছেলে, কেউ মাস্টারের ছেলে, একজন ছিল নাপিত। কেউ কাউকে চেনে না, তবু একসাথে হাঁটছে।
বর্ডার পার হওয়ার সে রাতে আকাশ মেঘলা। অন্ধকারে পথ চেনা যাচ্ছে না। বিমল কুণ্ডু দলের গাইড, সে বলল চুপ করে থাকতে, একটা কথাও নয়। কুবাদ সেই রাতে বুঝল নিঃশব্দতারও একটা ওজন আছে—সেই ওজন বুকে চেপে বসে, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।
কুবাদ বাড়ি ফিরে এল। সাইদও ফিরল, তবে দুটো কালো গর্ত নিয়ে, যেখানে একসময় চোখ ছিল। গ্রামের মানুষ তাকে ডাকতে লাগল কানা সাইদ বলে। সাইদ কিছু বলত না। সে হাঁটত, থামত, শুনত। দেখতে পেত না, কিন্তু টের পেত সব।
ট্রেনিং হলো। অস্ত্র ধরতে শিখল। শিখল মাটিতে শুয়ে থাকতে, ক্ষুধা সহ্য করতে, ঘুমের মধ্যেও কান খোলা রাখতে।
তারপর ফিরে এল। ১১ নম্বর সেক্টর। সাইদের সঙ্গে পরিচয় হলো একদিন সন্ধ্যায়।
কুবাদ তাকে দেখেই চিনতে পারল—মানিকহাটের ছেলে, এক ক্লাস ছোট। রোগা পাতলা, মুখে সবে গোঁফের রেখা, কিন্তু চোখে একধরনের আলো, যে আলো কোথা থেকে আসে বলা মুশকিল।
সেই রাতে দুজনে অনেকক্ষণ কথা বলল। মানিকহাটের কথা, বিলের কথা, পরিচিত মানুষের কথা।
কথায় কথায় সাইদ একটা নাম বলল, জজ সাহেবের নাম।
কুবাদ চমকে উঠল: ‘তুই জজ সাহেবকে চিনিস?’
সাইদ একটু থামল। তারপর বলল: ‘চিনি।’ কিন্তু ঠিক কীভাবে চেনে, সেটা আর বলল না।
কুবাদ জিজ্ঞেস করল না। যুদ্ধের মাঝে কিছু প্রশ্ন করতে নেই, উত্তর না জানাটাই কখনো কখনো নিরাপদ।
একদিন মাইন ধ্বংস করতে গিয়ে কুবাদ আঘাত পেল। কয়েক দিনের বিশ্রাম দরকার। সাইদ সেদিন পাহারায় ছিল একা।
পরের দিন যা হলো, কুবাদ নিজের চোখে দেখেনি, তবু সারা জীবন অনুভব করতে পারবে। বিভীষিকাময় অন্ধকার রাত্রের করুণ চিত্র।
পাকিস্তানি মিলিটারি একা পেয়েছিল সাইদকে। তারা সাইদের চোখ দুটো তুলে নিয়ে গেছে।
সাইদ যখন চিৎকার করল, সেই আওয়াজে গাছের পাখি উড়ে গেল দূর আকাশে। প্রকৃতির এই নিয়ম বড় অদ্ভুত—পাখিরা কাঁদে, কিন্তু কিছু মানুষ পাষাণ পাথর। তাদের হৃদয়ে কখনো ভালোবাসা জেগে ওঠে না। সেদিন থেকে কুবাদের ঘুমের মধ্যে একটা শব্দ থাকত। সাইদের সেই চিৎকার। সে কাউকে বলেনি কোনো দিন—রাহেলাকেও না। কয়েক মাস পরেই দেশ স্বাধীন হলো।
কুবাদ বাড়ি ফিরে এল। সাইদও ফিরল, তবে দুটো কালো গর্ত নিয়ে, যেখানে একসময় চোখ ছিল। গ্রামের মানুষ তাকে ডাকতে লাগল কানা সাইদ বলে। সাইদ কিছু বলত না। সে হাঁটত, থামত, শুনত। দেখতে পেত না, কিন্তু টের পেত সব। গ্রামের মাটির ঘ্রাণ শুঁকে বুঝতে পারত বাজারের সড়ক কোন দিকে গেছে।
কুবাদ লক্ষ করেছিল—সাইদ গ্রামে ফিরেও কারও সাথে বেশি মেশে না। একটু দূরত্ব রাখে। যেন কিছু একটা তাকে আলাদা করে রেখেছে, ভেতর থেকে।
একদিন কুবাদ জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তুই ঠিক আছিস তো?’
সাইদ বলল, ‘আছি।’
‘কিছু বলার থাকলে বলতে পারিস।’
একদিন গ্রামে একটা গুজব রটল। কেউ বলছে, জজ সাহেব নাকি যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি মিলিটারিকে সাহায্য করেছিলেন। গোপনে খবর দিয়েছিলেন। কোথায় মুক্তিযোদ্ধারা আছে, সেই তথ্য পাচার হয়েছিল তাঁর মাধ্যমে।
সাইদ একটু হাসল। সেই হাসিতে একটা ক্লান্তি ছিল—অনেক পুরনো, অনেক গভীর। তারপর বলল, ‘কিছু কথা বলতে নেই, কুবাদ ভাই।’
কুবাদ বুঝল এই দরজা বন্ধ। সে আর ঠেলেনি।
স্বাধীনতার পর শিয়াল ছিল, শকুনও ছিল। তারা মানুষের ভালো থাকা সহ্য করতে পারত না। তারা সমাজের ভেতর দেয়াল তৈরি করতে চেষ্টা করত।
যারা যুদ্ধে যায়নি, তারাই সবচেয়ে জোরে বুক ফুলিয়ে বলল, ‘আমি মুক্তিযোদ্ধা।’ ক্ষমতার চেয়ার দ্রুত বদলাতে শুরু করল।
একদিন গ্রামে একটা গুজব রটল। কেউ বলছে, জজ সাহেব নাকি যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি মিলিটারিকে সাহায্য করেছিলেন। গোপনে খবর দিয়েছিলেন। কোথায় মুক্তিযোদ্ধারা আছে, সেই তথ্য পাচার হয়েছিল তাঁর মাধ্যমে।
কুবাদ গুজবটা শুনল।
সে রাতে সে ঘুমাতে পারল না।
লুডু তাকে যে নামগুলো দিয়েছিল সেই রাতে মাঠের ধারে—সেই নামগুলোর কথা মনে পড়ল। কীভাবে জানত লুডু? জজ সাহেব কি সত্যিই...
কুবাদ ভাবনাটা সম্পূর্ণ করল না। মাথার ভেতরে একটা রেখা টেনে বন্ধ করে দিল। কিছু সত্য জানার চেয়ে না জানাই ভালো। কারণ, সত্যটা জানলে লুডুর মুখটা মাথায় আসে;< সেই মুখটা কুবাদ ঘেন্না করতে পারে না।
লুডু তার সাথে কোনো দিন বিশ্বাসঘাতকতা করেনি।
কিন্তু লুডুর বাবা?
একদিন বাজারে জজ সাহেবের সঙ্গে দেখা হলো। বৃদ্ধ হয়েছেন, চুল পেকেছে, কিন্তু চোখ দুটো এখনো তীক্ষ্ণ।
তিনি কুবাদকে দেখে থামলেন। ‘কুবাদ, ভালো আছো?’
‘জি।’
‘শুনলাম স্কুল করছ গ্রামে।’
‘চেষ্টা করছি।’
জজ সাহেব একটু চুপ থাকলেন। তারপর বললেন, ‘আমি কিছু টাকা দিতে চাই। স্কুলের জন্য।’
কুবাদ সরাসরি তাঁর চোখের দিকে তাকাল। জজ সাহেব চোখ নিচে রাখলেন।
সেই চোখে কী ছিল—অপরাধবোধ, না সাহায্যের ইচ্ছা, না অন্য কিছু—কুবাদ বুঝতে পারল না।
সে টাকা নিল না। বলল,‘দরকার নেই।’
ফিরে আসতে আসতে তার মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরতে লাগল, সাইদের চোখ যেদিন গেল, সেদিন মিলিটারি সেখানে পৌঁছাল কীভাবে? কে জানত সাইদ সেখানে একা থাকবে?
এই প্রশ্নের উত্তর কুবাদ কোনো দিন খোঁজেনি।
কারণ, উত্তরটা পেলে যদি লুডুর দিকে আঙুল উঠত—সেই ভার বহন করার শক্তি তার ছিল না। মানিকহাটের স্কুলের কথাটা কুবাদ প্রথম তুলেছিল একদিন বাজারে। সাইদ পাশে ছিল।
‘গ্রামে একটা হাইস্কুল দরকার,’ কুবাদ বলল। ‘ছেলেমেয়েগুলো সাতবাড়িয়া যেতে যেতে ঝরে পড়ছে।’
সাইদ বলল, ‘করতে পারবি?’
‘পারব।’
অনেক বছর লাগল।
টাকা জোগাড় হলো ধীরে ধীরে স্কুলঘর তৈরি হলো। কুবাদ নিজের জমির একটা অংশ দিল। সাইদ দিল তার সামান্য সঞ্চয়। গ্রামের মানুষ এগিয়ে এল—কেউ ইট, কেউ বাঁশ, কেউ শুধু শ্রম। স্কুলটা উঠল।
প্রথম দিন যখন বাচ্চারা এসে ঘরে বসল, কুবাদ বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। ভেতরে ঢোকেনি। সাইদ পাশে দাঁড়িয়ে বলল, ‘ভেতরে যাস না কেন?’ তখন কুবাদের চোখ বেয়ে অশ্রু বেয়ে পড়ল।
কুবাদ বলল, ‘একটু পরে।’
সাইদ বুঝতে পেরেছিল তার চোখ ভিজে কণ্ঠ ভারী হয়ে গেছে।
শেষ বয়সে টাকার কষ্ট হলো।
রাহেলার শরীর ভালো না, ওষুধ লাগে। ছেলেরা যে যার মতো চলে গেছে—কেউ শহরে, কেউ বিদেশে। বড় ছেলে টাকা পাঠায় মাঝে মাঝে, কিন্তু নিয়মিত না। সংসারের খরচ বাড়তে থাকে, আয় কমে গেছে। কুবাদ কারও কাছে হাত পাতে না। এটা তার স্বভাব না।
একদিন একটা চিঠি এল।
খামের ওপর কোনো নাম নেই, ঠিকানা নেই। ভেতরে কয়েকটা কথা-হাতের লেখা, কাঁপা কাঁপা।
‘কুবাদ, আমি জানি তুমি অনেক কষ্টে আছ। তোমার স্কুলের জন্য কিছু করতে চেয়েছিলাম। পারিনি। ক্ষমা করো।’
নিচে কোনো স্বাক্ষর বা কারও নাম নেই।
কুবাদ চিঠিটা অনেকক্ষণ ধরে রইল। তারপর রাহেলাকে দেখাল।
রাহেলা পড়ল। জিজ্ঞেস করল, ‘কে লিখেছে?’
‘জানি না।’
সাইদ হঠাৎ বলল, ‘কুবাদ ভাই, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?’ ‘হ্যাঁ।’ ‘যদি জানতে পারতিস সেদিন আমার চোখের কথা কে জানিয়েছিল মিলিটারিকে, তুই কী করতিস?’ বুকের ভেতরটা একবার কেঁপে উঠল কুবাদের। সে অনেকক্ষণ চুপ থাকল।
রাহেলা আর কিছু বলল না। কিন্তু কুবাদ জানত; কিন্তু নিশ্চিত ছিল না। আর নিশ্চিত না হওয়াটাই হয়তো তার পছন্দ।
সে চিঠিটা ভাঁজ করে রাখল বুক পকেটে।
সেই রাতে সাইদ এল। লাঠিতে ভর দিয়ে, দুজনে বসল উঠোনে। আমগাছের ছায়ায়।
‘কী ভাবছিস?’
‘একটা চিঠি পেয়েছি।’
‘কার?’
‘জানি না।’
সাইদ কিছু বলল না। কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে সামান্য একটু ভাঁজ পড়ল, হাসি কি না বোঝা গেল না।
কুবাদ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল, ‘তুই জানিস কে লিখেছে?’
সাইদ বলল, ‘না।’
মিথ্যে বলছে কি না বোঝার উপায় নেই। অন্ধ মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে মিথ্যে কথা ধরা যায় না।
দুজন চুপ করে বসে রইল।
দূরে কোথাও স্কুল ছুটি হচ্ছে, ছুটির ঘণ্টার শব্দ শোনা যাচ্ছে। ছেলেমেয়েদের কোলাহল ভেসে আসছে হাওয়ায়।
কুবাদ বুক পকেটে হাত দিল। চিঠিটা আছে—ভাঁজ করা, একটু কুঁচকানো।
সে আর কোনো দিন জানতে চাইবে না কে লিখেছে।
কিছু উত্তর না জানাই ভালো।
কারণ, উত্তরটা পেলে হয়তো পুরোনো একটা দরজা খুলে যাবে—আর সেই দরজার ওপারে কী আছে, সেটা কুবাদ এই বয়সে দেখতে চায় না।
সন্ধ্যা নামছে। আমগাছের ছায়া দীর্ঘ হচ্ছে। মনে হচ্ছে এই আমগাছই পৃথিবীর দীর্ঘ আমগাছ।
সাইদ হঠাৎ বলল, ‘কুবাদ ভাই, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?’
‘হ্যাঁ।’
‘যদি জানতে পারতিস সেদিন আমার চোখের কথা কে জানিয়েছিল মিলিটারিকে, তুই কী করতিস?’
বুকের ভেতরটা একবার কেঁপে উঠল কুবাদের।
সে অনেকক্ষণ চুপ থাকল।
তারপর বলল, ‘তুই এই প্রশ্নটা আজকে করলি কেন? জানিস না কী করতাম।’
তারপর সাইদ কোনো জবাব দিল না। সে জানে কুবাদের মতো সৎ দেশপ্রেমিক আছে বলেই আমরা বেঁচে থাকার ভরসা পাই।
উঠোনে অন্ধকার ঘন হয়ে আসছে। কোথাও একটা ঝিঁঝি পোকা ডাকছে—একটানা, নিরলস।
কুবাদ সাইদের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সাইদের মুখে কোনো ভাষা নেই, চোখের গর্ত দুটো অন্ধকারের দিকে ফেরানো।
রাহেলা রুমের ভেতর থেকে ডাকল, ‘খেতে আসো।’
কুবাদ উঠল।
সাইদও উঠল-লাঠিতে ভর দিয়ে, ধীরে।
দুজনে খাবার ঘরের দিকে হাঁটল।
যে প্রশ্নটা মাঝখানে পড়ে রইল, সেটা কেউ আর তুলল না।
তিন দিন পর সাইদ মারা গেল।
খুব ভোরে। ঘুমের মধ্যে।
কুবাদ যখন খবর পেল, তখন উঠোনে দাঁড়িয়ে ছিল। পায়ের তলায় শিশিরভেজা মাটি। আকাশে তখনো ভোরের আলো পুরোপুরি ফোটেনি। সে কাঁদল না।
শুধু বুক পকেট থেকে চিঠিটা বের করল। ভাঁজ খুলল। একবার পড়ল।
তারপর ধীরে ধীরে ছিঁড়ে ফেলল।
টুকরোগুলো হাওয়ায় উড়ে গেল—সাদা বকপক্ষীর মতো, হালকা, ভোরের নিয়ন আলোয়।
কুবাদ সেদিকে আর তাকাল না।
ঘরে ঢুকে গেল। ফিসফিস করে বলে উঠল, লুডুর পরিবার একটা মীরজাফর, দেশদ্রোহী।