প্রেমার মুখে অ্যাসিড: প্রতিবেশী হিসেবে আমাদের দায়বদ্ধতা

· Prothom Alo

বর্তমান সময়ে আমরা আমাদের সন্তানদের বেড়ে ওঠা নিয়ে বেশ সচেতন। তাদের নিরাপদ ও সুরক্ষিতভাবে বেড়ে ওঠা আমাদের প্রত্যাশা। সামাজিকতা, প্রয়োজন কিংবা পারিবারিক সুসম্পর্কের কারণে আমরা অনেক সময় সন্তানদের আশপাশের বাড়ি, প্রতিবেশী বা আত্মীয়স্বজনের বাসায় নিয়ে যাই বা পাঠিয়ে দিই। পরিচিত মানুষ, পরিচিত পরিবেশ—তাই স্বাভাবিকভাবে সেখানে আমরা একধরনের ভরসা খুঁজে পাই। শিশুরাও স্বাচ্ছন্দ্যে খেলাধুলা করে, সময় কাটায়, মিশে যায় আপনজনদের সঙ্গে।

সেই চেনা পরিবেশ কতটা নিরাপদ হওয়া প্রয়োজন, বাস্তব ঘটনার আলোকে আজকের এই লেখা।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

রাব্বি পাবনা শহরে একটি স্টুডিওর দোকানে কাজ করেন। ছোটখাটো সংসার, ভাড়া বাসায় থাকেন। তাঁদের একমাত্র কন্যা প্রেমা, বয়স দুই বছর আট মাস। মেয়েকে ঘিরেই তাঁদের সুখের সংসার।

প্রেমার কোনো রকম দুর্ঘটনা যেন না ঘটে, সে জন্য রাব্বি ও তাঁর স্ত্রী সব সময়ই সচেতন। নিজেদের বাসার প্রেমার হাতের নাগালে থাকা সমস্ত বৈদ্যুতিক সুইচ ও সংযোগ নিষ্ক্রিয় করে রেখেছিলেন, যাতে কোনোভাবেই তাদের সন্তানের বিদ্যুৎস্পর্শের ঝুঁকি না থাকে।

বাড়িওয়ালার সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক ছিল আন্তরিক ও ঘনিষ্ঠ। বাড়িওয়ালারও ১৪ মাস বয়সী একটি ছেলেসন্তান আছে। প্রেমা প্রতিদিনই তাদের বাসায় খেলতে না গেলে ছোট শিশুটিও যেন ব্যাকুল হয়ে পড়ত।

একদিন দুপুরবেলা খেলতে খেলতে প্রেমা নিজে থেকেই চলে যায় বাড়িওয়ালার বাসার। সেখানে তাকে কেক খেতে দেওয়া হয়। সেই সময় বাড়ির নারীরা সবাই দুপুরের রান্নাবান্নার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। কেক খেতে খেতে প্রেমার গলা শুকিয়ে আসে, তীব্র পিপাসা পায়। হাতের কাছে পাওয়া টাইলস ক্লিনারের অ্যাসিডভর্তি বোতলটি সে পানি ভেবে তুলে নেয় এবং এক চুমুক মুখে দেয়।

অ্যাসিড মুখে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তীব্র দুর্গন্ধ ও যন্ত্রণায় চিৎকার করে ওঠে প্রেমা এবং মায়ের কাছে ছুটে আসে। মুহূর্তের মধ্যে গোটা ঘরে বিষাক্ত গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি বুঝে মা আঁচ করেন, প্রেমা ভুল করে অ্যাসিড মুখে নিয়েছে। একমুহূর্ত দেরি না করে নিয়ে যাওয়া হয় পাবনা জেনারেল হাসপাতালে।

পাবনা জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক শিশুটিকে তৎক্ষণাৎ নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখেন এবং দ্রুত ঢাকা অথবা রাজশাহীর কোনো বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। ইতিমধ্যে প্রেমার দুই ঠোঁট ভীষণভাবে ফুলে ওঠে এবং মুখের ভেতরে তীব্র জ্বালা ও ব্যথা অনুভব হতে থাকে।

পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় অ্যাম্বুলেন্সে করে প্রেমাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উদ্দেশে নেওয়া হয়। যাত্রাপথে চিকিৎসকের পরামর্শমতো অল্প অল্প করে এন্টাসিড প্লাস সাসপেনশন খাওয়ানো হয় তাকে।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে প্রেমাকে ভর্তি করে বিশেষ পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। সঠিক চিকিৎসা ও নিবিড় তত্ত্বাবধানে ভয়ংকর অবস্থা ধীরে ধীরে থেকে উন্নতি হতে থাকে। প্রায় সাত দিন পর হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পায়। সৌভাগ্যক্রমে বড় কোনো স্থায়ী ক্ষতি হয়নি।

প্রেমার এ দুর্ঘটনা আমাদের সবার জন্যই একটি নির্মম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বার্তা রেখে গেছে—নিরাপত্তা শুধু নিজের চার দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আপনার সন্তান যে বাড়িতে পা রাখে, যে পরিবেশে সময় কাটায়, সেই জায়গার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও আপনার।

একটি শিশুর নিরাপত্তা শুধু তার মা–বাবার একার দায়িত্ব হতে পারে না। এটি একটি সমষ্টিগত সামাজিক দায়িত্ব। প্রতিবেশী হিসেবে, বাড়িওয়ালা হিসেবে, আত্মীয় হিসেবে; পরস্পরের শিশুকে নিরাপদ পরিবেশ দেওয়ার দায় আমাদের সবার। একটি অসতর্ক মুহূর্ত, একটি খোলা অ্যাসিডের বোতল কিংবা সামান্য অবহেলা কেড়ে নিতে পারে একটি শিশুর প্রাণ, মুহূর্তে বিধ্বস্ত হতে পারে একটি পরিবার।

শিশুরা ভুল করে। বড়দের ভুল করার সুযোগ নেই।

চিন্ময় কুমার সেন, ফার্মাসিস্ট

নাগরিক সংবাদ-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

Read full story at source