৪৩টি ফিলিং স্টেশন বন্ধ, ৩টিতে বিক্রি হচ্ছে শুধু পেট্রল

· Prothom Alo

মোটরসাইকেলে চড়ে পঞ্চগড়ের ধনীপাড়া থেকে ঠাকুরগাঁওয়ের ভুল্লির উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন আশরাফুল ইসলাম। যাচ্ছেন শ্বশুরবাড়িতে; সঙ্গে স্ত্রী ও দুই মেয়ে। মোটরসাইকেলের ট্যাংকে যতটুকু পেট্রল আছে, তা দিয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার যাওয়া যাবে। ময়দানদিঘী এলাকায় একটি ফিলিং স্টেশনে পেট্রল নেওয়ার জন্য দাঁড়িয়েছেন তিনি। জ্বালানি তেল না থাকায় পাম্পে বাঁশ ও দড়ি টানানো হয়েছে। ওপর প্রান্ত থেকে পাম্পের এক কর্মচারী পেট্রল নেই বলে ইঙ্গিত করলেন।

Visit milkshakeslot.com for more information.

এবার কী করবেন আশরাফুল? এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘কী আর করার, বোদাবাজারে গিয়ে গাড়িটা (মোটরসাইকেল) রেখে অটোতে উঠে যেতে হবে।’


ফিলিং স্টেশনগুলোয় জ্বালানি তেলের সরবরাহ না থাকায় ঈদের পরদিন থেকে এমন ভোগান্তিতে আছেন পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও দিনাজপুরের মানুষ। ফিলিং স্টেশন–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ডিপো থেকে চাহিদার বিপরীতে অর্ধেক পেট্রল যাওয়া যাচ্ছে। অকটেনের সরবরাহ বন্ধ। তবে চাহিদার বিপরীতে ডিজেল পাচ্ছেন ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষ। তাঁরা বলছেন, জ্বালানি তেল সরবরাহ করতে না পেরে গ্রাহকদের গালিগালাজ শুনছেন। ঈদের আগের রাতে ঠাকুরগাঁওয়ের হানিফ ফিলিং স্টেশনে ভবনের কাচ ভাঙচুর করেছেন উত্তেজিত গ্রাহকেরা।

তবে অভিযোগ রয়েছে গ্রাহকদেরও। কয়েকজন গ্রাহক বলছেন, তেল থাকতেও দিচ্ছে না, দাম বাড়ার অপেক্ষায় মজুত করেছেন পাম্পমালিকেরা। সিন্ডিকেট করে খুচরা পাইকারদের তেল দেওয়া হচ্ছে। ছোট ছোট বাজারে তেল বিক্রি হচ্ছে প্রতি লিটার ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায়।

ঠাকুরগাঁওয়ের কচুবাড়ি এলাকায় তিয়াস তিমু ফিলিং স্টেশন এলাকায় টংদোকানে বসা দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘বাড়িওলিকে (স্ত্রী) নিয়ে বিয়েবাড়িতে যাব। গাড়িত (মোটরসাইকেল) তেল নাই। বাড়ির পাশোত কাউয়ারডাঙ্গা বাজারে একজন খোলা তেল বিক্রি করছে। দাম চাইল ৩০০ টাকা লিটার। বাড়িওলিক অটোত উঠায় দিনু। মুই আর গেনুনি (গেলাম না)।’

আজ সোমবার দুপুর ১২টার দিকে পঞ্চগড় শহরের সিঅ্যান্ডবি মোড় থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে রওনা দেন প্রথম আলোর এ প্রতিবেদক। দিনাজপুর শহরের মডার্ন মোড়ে পৌঁছান বিকেল চারটায়। পঞ্চগড়-দিনাজপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের ৯৩ কিলোমিটারের ৪৬টি ফিলিং স্টেশন চোখে পড়ে। এর মধ্যে পঞ্চগড় থেকে ঠাকুরগাঁওয়ের সীমানায় ২৫টি পাম্প বন্ধ; সেখানে অকটেন ও পেট্রল নেই।

বীরগঞ্জ থেকে দিনাজপুর পর্যন্ত ২১টি পাম্পের মধ্যে ৩টিতে শুধু পেট্রল বিক্রি হচ্ছে। সেখানে গ্রাহকদের লম্বা সারি। কেউ মোটরসাইকেল নিয়ে পাম্পে হাজির হয়েছেন, কেউ বোতল নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। গ্রাহকদের ভিড়ে হিমশিম খাচ্ছেন পাম্পের কর্মীরা। সিরিয়াল ভাঙতে দেখলেই শুরু হচ্ছে হইহুল্লোড়, চিৎকার, চেঁচামেচি।

ফিলিং স্টেশনে বোতল হাতে লাইনে দাঁড়িয়েছেন অনেকেই। সোমবার বিকেলে দিনাজপুর শহরের মর্ডান মোড় এলাকায়

ঠাকুরগাঁওয়ের জাফর আলী ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেল নিয়ে অপেক্ষা করছেন মামুন রানা (৪৫)। তিনি পেশায় প্রকৌশলী। তিনি বলেন, ‘কয়েকটা সাইটে কাজ চলতেছে। বাইকে তেল না থাকায় কোথাও দৌড়াতে পারছি না। এলাকায় এখন আলুর মৌসুম চলতেছে। ব্যবসায়ীদের এ সময় বিভিন্ন জায়গায় ছোটাছুটি করতে হয়। যোগাযোগ করতে না পেরে তাঁরাও ভালো বিড়ম্বনায় পড়েছেন।’

মলয় চন্দ্র দাস ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করেন। দুপুর ১২টায় পেট্রলের খোঁজে এসেছেন পঞ্চগড়ের মৈত্রী পাম্পে। তিনি বলেন, ‘গাড়িতে তেল নাই। মার্কেটেও যেতে পারছি না। ফোনে ফোনে ওষুধের অর্ডার নিয়েছি।’

দিনাজপুরের মডার্ন মোড় এলাকায় রহমান ফিলিং স্টেশনে বোতল হাতে লাইনে দাঁড়িয়েছেন অনেকেই। তাঁদের একজন হুসেন আলী জানান, গতকাল রাতে পুলহাটে গাড়ির জ্বালানি শেষ হয় তাঁর। এরপর নিজ বাড়ি খোয়াড়ের মোড় পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার মোটরসাইকেলটি ঠেলে নিয়ে গেছেন। আজ মডার্ন মোড়ের পাম্পে জ্বালানি সরবরাহের কথা শুনে দুটি বোতল হাতে লাইনে দাঁড়িয়েছেন।

কয়েকটি ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক ও কর্মচারী জানান, প্রতিটি লরিতে (তেলবাহী ট্রাক) ডিজেল, পেট্রল, অকটেনের জন্য তিনটি চেম্বার থাকে। ডিপো থেকে শুধু ডিজেল পেয়েছেন। বাকি দুটি চেম্বার খালি। এতে পরিবহন খরচও বাড়ছে।

পাম্পগুলোয় দৈনিক পেট্রলের চাহিদা রয়েছে ৭০০ থেকে দেড় হাজার লিটার, অকটেন ৩৫০ থেকে ৭০০ লিটার। আর ডিজেলের চাহিদা দুই হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার লিটার। তারা ঈদের আগে জ্বালানি পেয়েছেন; তাও অর্ধেক।

ঠাকুরগাঁওয়ের চৌধুরী ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী বলেন, ‘গত শুক্রবার তেল পেয়েছি। তিন দিন পর আজ সাড়ে তিন হাজার লিটার পেট্রল পেলাম। সন্ধ্যায় গাড়ি এসে পৌঁছাবে। রেশনিং পদ্ধতিতে (প্রতিজন ২০০ টাকার) দেওয়া ছাড়া উপায় নাই। এখানে আমাদের হাতে কিছু নাই। ডিপো থেকে তেল না পেলে আমরা কী করব?’

জ্বালানি তেলের সরবরাহ না থাকায় বন্ধ আছে ফিলিং স্টেশন। সোমবার পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায়

পঞ্চগড় ধাক্কামাড়া এলাকায় একটি পাম্পের কর্মচারী ফারুক আলম বলেন, ‘একটা অ্যাম্বুলেন্স যদি আসে, একফোঁটা জ্বালানি দিতে পারব না। আর পেট্রল, যার দুই লিটার হলেও চলবে, সে নিচ্ছে পাঁচ লিটার। আমরা দুই লিটারের বেশি দিই না। অনেকে এ পাশ থেকে তেল নিয়ে, আবার পেছন থেকে লাইনে দাঁড়াচ্ছে। যদি তেলের সংকট আরও বাড়ে, এই ভেবে মানুষ রিজার্ভও করছে।’

পেট্রল-অকটেনের সংকট প্রকট হলেও ডিজেলের সবররাহ অপেক্ষাকৃত স্বাভাবিক। নুরে আলম সিদ্দিক নামের এক ট্রাকচালক বলেন, ডিজেলের সংকট এখন বোঝা যাবে না। কারণ, অনেকেই ট্রাকে ফুল ট্যাংকি করে রেখেছেন। ঈদ শেষ, এখন ট্রাকগুলো চলা শুরু করলে ডিজেলের সংকট কতটা, তা বোঝা যাবে।’

Read full story at source