‘স্বাধীনতা তুমি উঠোনে ছড়ানো মায়ের শুভ্র শাড়ির কাঁপন’

· Prothom Alo

গল্পের শিরোনাম হচ্ছে ‘স্বাধীনতা তুমি উঠোনে ছড়ানো মায়ের শুভ্র শাড়ির কাঁপন।’গল্পটি বলছি, শুনুন দয়া করে। তারপর বলব এর পেছনের গল্প।

Visit somethingsdifferent.biz for more information.

মার্চ মাসের ১৫ তারিখ,১৯৮৫ সাল। বাংলাদেশের যশোর জেলার আরবপুর ইউনিয়নের খোলাডাঙ্গা গ্রামে সন্ধ্যা নামছে।

শহর থেকে খোলাডাঙ্গা গ্রামটি খুব বেশি দূরে নয়। যশোর বিমানবন্দর থেকে মাত্র দেড় মাইল দূরে ধর্মতলার মোড়। ওখানে পৌঁছে যে কাউকে জিজ্ঞাসা করলে খোলাডাঙ্গায় যাওয়ার রাস্তা বলে দেবে।

সে সন্ধ্যায় ইউনিয়ন পরিষদের অফিস থেকে সামান্য দূরে বড় বড় সোজা দাঁড়িয়ে থাকা গাছেঘেরা ছোট্ট মাঠে গোলপাতার চাটাই বিছিয়ে হারিকেন জ্বালিয়ে আমরা কজন বসেছি। চারটি চাটাই এমনভাবে পাতা হয়েছে যে মাঝখানে একটি আয়তক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। মনে হয়, পৃথিবীর বড় কোনো শহরে নামীদামি কনফারেন্স রুমে টেবিল সাজানো হয়েছে। চার কোনায় চারটি হারিকেন আলো দিচ্ছে। এই ইউনিয়নে বিদ্যুৎ আছে তবে মাঠে আলো পাওয়ার ব্যবস্থা নেই।

মার্চ মাস স্বাধীনতার মাস। স্বাধীনতার পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করলে যশোর একটি ঐতিহাসিক শহর। যশোর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাত থেকে প্রথম মুক্ত হয়। ওই দিনই ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। আর আমাদের মাতৃভূমি পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন দেশ হিসেবে ভেসে উঠেছিল।

স্বাধীনতার মাসে ঐতিহাসিক শহরে অসাধারণ এক সন্ধ্যায় আমরা কজন স্বাধীনতার গল্প বলতে বসেছিলাম। ব্রিটিশ অক্সফামের ট্রিসিয়া পার্কার ও হোসনে আরা খান, উবিনীগ-এর ফরিদা আকতার বর্তমানে নারীগ্রন্থ প্রবর্তনার প্রধান, এশিয়া ফাউন্ডেশনের একজন ও আমি।

'ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার, পরানসখা বন্ধু হে আমার'

ঢাকা থেকে আমরা কয়েকটি দাতা সংস্থার অনুরোধে স্থানীয় কটি সংস্থার কার্যক্রম দেখতে গিয়েছিলাম। কাজটা ছিল ইভ্যালুয়েশনের। কাজ শেষে পরদিন সকালের ফ্লাইটে ঢাকায় ফিরে যাব।

স্থানীয় সংস্থার কর্মী ও আমরা সবাই মিলে ঠিক করলাম, আজ সন্ধ্যাটা আমরা স্বাধীনতার গল্প বলে কাটাব। গাছের নিচে মাঠের মধ্যে মাদুর পেতে হারিকেনের আলোয় গল্পসন্ধ্যা। কথা শুরু হতে দেখা গেল, প্রত্যেকের স্মৃতির ঝাঁপিতে স্বাধীনতা নিয়ে গান, কবিতা ও নানা ঘটনা লুকানো রয়েছে। ট্রিসিয়া বলল একটি গানের গল্প। বিটলসের জর্জ হ্যারিসনের গাওয়া গানটি ওরা গেয়ে গেয়ে লন্ডনের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে মানুষকে সচেতন করেছে ও চাঁদা তুলেছে। দুটি ছেলে উদাত্ত গলায় গাইল ‘একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি’ ওরা যখন ‘যে শিশুর মধু হাসিতে আমার বিশ্ব ভোলে, সেই শান্তির শিবির বাঁচাতে আজকে লড়ি’ গাইছিল, সবাই তখন গলা মিলালাম। আবেগ ও আন্তরিকতা গলার সুরের অভাবকে দূর করে দিল।

ইচ্ছা হলো কবিতা পড়ার। কবিতার সমঝদার কেউ ছিলেন কি না, জানিনা, তবে সেই অসাধারণ সন্ধ্যায় আমরাও সবাই অসাধারণ হয়ে উঠেছিলাম। তাই কবিতা শুনতেও কারও আপত্তি ছিল না। কবি শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি’ আরও অনেকের মতো আমারও খুব প্রিয় কবিতা। মাঝেমধ্যে পড়তাম বলে প্রায় মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল। যেটুকু মনে ছিল, তাই দরদ দিয়ে পড়লাম।

অন্ধকার গাঢ় হয়ে এসেছিল। মনে হলো, একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস যেন পড়ল। বাতির আলোতে সবার চেহারা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। আমি যখন ‘স্বাধীনতা তুমি উঠোনে ছড়ানো মায়ের শুভ্র শাড়ির কাঁপন’ পড়ছিলাম, তখন মনে হলো কেউ ফুঁপিয়ে উঠল হঠাৎ করে। কবিতা থেমে গেল। চারদিক চুপচাপ। সবাই নীরবে কান্নার উৎস খুঁজছিল। অন্ধকার ও নৈঃশব্দের মাঝে কিছু বোঝা যাচ্ছিল না। শুধু দেখা গেল চাটাইয়ের এক কোনায় স্থানীয় সংস্থায় কাজ করা শ্যামলা অবয়বের ও হালকা কোকড়ানো চুলের কিশোয়ার নামের তরুণটি হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে আছে। একটু পরই কিশোয়ার মুখ তুলল। সবার চোখ ওর দিকে। সব চোখেই জিজ্ঞাসা। আলো কম থাকাতে ওর চোখ ভেজা কি না, বোঝা গেল না।

কিশোয়ার স্বাধীনতার গল্প বলল। কিশোয়ারের গল্পের দুঃখের হিমে আমাদের চোখে শিশির জমল। শামসুর রাহমানের কবিতার ওই লাইন, ওই শব্দগুচ্ছ কিশোয়ারের জীবনের করুণ সত্যের বিবৃতি।

সেই ১৯৭১–এ ছেলেটি কুমিল্লার ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ত। মার্চ বা এপ্রিলের এক অস্থির দিনে সে স্কুল থেকে বাসায় ফিরল। মূল সড়ক থেকে গলিতে ঢুকলেই ওদের বাসাটি দেখা যেত। আর একটু এগোলেই উঠানের এক অংশ চোখে পড়ত। প্রতিদিন যে দৃশ্য দেখত, তা হলো উঠানে দড়িতে মায়ের ভেজা শাড়ি দুলছে। তারপর যা দেখা যাবে, তা সে না দেখেই বলে দিতে পারত। উঠান পেরিয়ে বারান্দায় মোড়াতে বসে মা খবরের কাগজ পড়ছেন। পিঠে তাঁর ভেজা চুল ছড়ানো। প্রতিদিন স্কুল থেকে ফিরে যে ছবি সে দেখত, ওই দিন সে ছবি চুরি হয়ে যায়, লুট করেছিল, ধ্বংস করেছিল পাকিস্তানি বাহিনী।

এসএমআই লিখলেন ‘He must be discussed’

সেদিন উঠানে মায়ের শাড়ি ঝোলানো না দেখে ছেলেটি অবাক হয়। দুঃশ্চিন্তা করার মতো বয়স ওর ছিল না। তবে দৌড়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে যা দেখল, তাতে চিৎকার করে কান্না ছাড়া করার কিছু ছিল না। রান্নাঘরের দরজায় মায়ের রক্তাক্ত শরীর পড়ে ছিল।

ওই কোলাহলহীন নীরব–নিথর দিনে ওর কান্নাকাতর চিৎকার অনেক দূরে ছড়িয়ে পড়েছিল। কেউ একজন ছুটে এসে মুখ চাপা দিয়ে ওকে কোলে তুলে নিয়ে পালায়। পরে অশোক নামের এই ছেলেকে তারই স্কুলের অ্যাকাউন্ট্যান্ট যশোরের কাজী সাহেব পুত্রস্নেহে আগলে নিজ বাড়ি যশোরে নিয়ে এলেন। বাড়ি এসে সন্তানহীনা স্ত্রীকে বলেন, ‘এ আমাদের সংসারে নতুন চাঁদ, ওর নাম কিশোয়ার।’

নিঃসন্তান কাজী সাহেব ও আসমা খানমের সংসারে কিশোয়ার চাঁদের মতোই আদর পেল।

কাজী সাহেব অনেক খোঁজখবর করেছেন। কিশোয়ার নিজেও মেট্রিক ও ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার পর দুবার কুমিল্লা ও ময়নামতি চষে বেড়িয়েছে বাবা-কাকাদের খোঁজে। কোনো হদিস মেলেনি।

যেদিন ১৯৭১–এ আমাদের কুমিল্লার স্বাধীনতা হরণ হলো, ওই দিন থেকে অশোক তথা কিশোয়ারের মায়ের শাড়ি আর কখনো উঠানে দোলেনি।

গল্পের পেছনে কোনো সত্য কি থাকে কখনো? কথা হলো গল্প তো কল্পনা করেই লেখা হয়। তবু কোনো কোনো গল্প শেষে প্রশ্ন জাগে মনে, জানতে ইচ্ছা হয় কখনও–বা। এই গল্প শুনে প্রশ্ন করা হয় এটি সত্য ঘটনার ভিত্তিতে লেখা কি না। বেশ আগে অস্ট্র্রেলিয়ার রেডিও ঝইঝএ যখন পঠিত হয় তখনো গল্প শেষে এই প্রশ্ন আমাকে করা হয়েছিল।

ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট থেকে মার্চ মাসে প্রাণ বাঁচাতে পলাতক সেনাবাহিনীর সদস্য এক জ্ঞাতিভাই বলেছিলেন ছোট্ট এক হিন্দু ছেলের গল্প। ছেলেটির নাম অশোক, যাকে ধর্মভীরু এক মুসলমান বাঁচানোর জন্য যশোরে নিয়ে গিয়েছিলেন। অশোকের অস্তিত্ব অলীক নয়।

আর সত্য যশোরের খোলাডাঙ্গা গ্রামের মার্চের সেই সন্ধ্যা।

শামসুর রাহমানের কবিতা সত্য, যা জীবনের গল্প বলে যায়।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

Read full story at source