ভালো ঘুমের জন্য যা করণীয়

· Prothom Alo

বর্তমান সময়ে অনিদ্রা একটি বাড়তে থাকা সমস্যা। মানসিক চাপ, স্ক্রিনের অতিরিক্ত ব্যবহার ও অনিয়মিত জীবনযাপনের ফলে বাড়ছে অনিদ্রা। এটা মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও স্বাস্থ্যে ক্রমাগত নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

ঘুম যে কত মজার বিষয়, সেটা টের পাওয়া যায় ঘুম না হলে। ঘুমের মতো শান্তি আর কিছুতে পাওয়া যায় না। রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে না পারলে তার প্রভাব কিন্তু পরদিন সকালে পড়বেই। শুধু তা–ই নয়, এ সমস্যা দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকলে আমাদের স্বাস্থ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বর্তমানে পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত নানা সমস্যায় ভুগছেন অনেকেই। আবার অনেকেরই ঘুম ভীষণ পাতলা। ফলে রাতে প্রায়ই ঘুম ভেঙে যায়। এর প্রভাবে পরদিন সারা দিনই থাকে বিরক্তি ভাব।

Visit syntagm.co.za for more information.

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় (বিশেষ করে ২০২০ সালের পর থেকে) অনিদ্রা বা ইনসমোনিয়ার সমস্যা অনেক বেড়েছে। এর পেছনে কয়েকটি বড় কারণ হলো:
• অতিরিক্ত চাপ, দুশ্চিন্তা, অর্থনৈতিক চাপ, কাজের চাপ ও মানসিক অস্থিরতা (অনেকের ক্ষেত্রে বিষণ্নতা ও উদ্বেগ)।

স্ক্রিনটাইমের পরিমাণ বৃদ্ধি দায়ী অনিদ্রার জন্য


• মুঠোফোন, ল্যাপটপ, টিভি-স্ক্রিনটাইমের পরিমাণ বৃদ্ধি। যেহেতু রাতে শোয়ার আগে ব্লু লাইট মেলাটোনিন হরমোন কমিয়ে দেয়।
• অনিয়মিত রুটিন, শিফট ওয়ার্ক, বাড়ি থেকে কাজ করা, ঘুমের সময়সূচি নষ্ট হওয়া।
• ক্যাফেইন (চা-কফি), অ্যালকোহল বা ধূমপানের অভ্যাস।
• মহামারি-পরবর্তী জীবনযাত্রা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং কম শারীরিক পরিশ্রম।

ভালো ঘুম হওয়ার জন্য কিছু বিষয়ে খেয়াল রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। যেমন প্রতিদিন মোটামুটি একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়ার চেষ্টা করা। ঘুমাতে যাওয়ার বেশ খানিক সময় আগেই রাতের খাবার সেরে নেওয়া। আর স্ক্রিন অর্থাৎ মুঠোফোন, ল্যাপটপ ইত্যাদি যন্ত্র নিয়ে একেবারেই বিছানায় ঘুমাতে না যাওয়া। তবে বর্তমানে সময়ে এত নিয়ম মেনে চলা অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয়।

অনিদ্রা (ইনসমোনিয়া) একটি জটিল সমস্যা, এর পেছনে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত একাধিক স্নায়ুজৈবিক, শারীরবৃত্তীয় ও মনস্তাত্ত্বিক কৌশল কাজ করে। অনিদ্রার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো হাইপারঅ্যারাউজাল অর্থাৎ শরীর ও মস্তিষ্কের অতিরিক্ত সক্রিয়তা যা ঘুমের প্রক্রিয়াকে বাধা দেয়।

ঘুম নিয়ন্ত্রণের মৌলিক দুটি প্রক্রিয়া আছে। এক. হোমিওস্ট্যাটিক স্লিপ ড্রাইভ; এতে জাগ্রত অবস্থায় মস্তিষ্কে অ্যাডেনোসিন জমা হয়, যা ঘুমের চাপ তৈরি করে। ভেন্ট্রোল্যাটারাল প্রিঅপটিক নিউক্লিয়াস (VLPO) ও MnPO নিউরনগুলো গামা-অ্যামিনোবিউটাইরিক অ্যাসিড (GABA) ও গ্যালানিন নিঃসরণ করে অ্যারাউজাল সেন্টারগুলোকে (লোকাস কোয়েরুলিয়াস, র‍্যাফ নিউক্লিয়াস) দমন করে ঘুম আনে।
দুই. সার্কাডিয়ান রিদম বা জৈব ঘড়ি; সুপ্রাকিয়াসম্যাটিক নিউক্লিয়াস মস্তিষ্কের ‘মাস্টার ক্লক’ আলো-অন্ধকার চক্র দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। অন্ধকারে পিনিয়াল গ্ল্যান্ড থেকে মেলাটোনিন নিঃসৃত হয়, যা ঘুমের প্রস্তুতি নেয়।
অনিদ্রায় এই দুটি প্রক্রিয়ার মধ্যে সমন্বয়হীনতা ঘটে, বিশেষ করে হাইপারঅ্যারাউজালের কারণে প্রসেসে ঘুম-চাপ সত্ত্বেও জাগরণ-প্রভাবক ব্যবস্থা চালু থাকে।

আপনি জানলে অবাক হবেন যে রাতে ভালো ঘুমের জন্য কিছু খাবার রয়েছে। এগুলো শুতে যাওয়ার আগে অর্থাৎ ঘুমানোর আগে খেলে উপকার মেলে। চলুন, বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক—

• যদি আপনি শান্তিপূর্ণ ঘুম চান, তাহলে অবশ্যই আপনার খাদ্যতালিকায় আমন্ড অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। প্রতিদিন মাত্র ৬ থেকে ৭টি আমন্ড বাদাম খেলে আপনার অনিদ্রার সমস্যা দূর হতে পারে। খাদ্যতালিকায় বাদাম অন্তর্ভুক্ত করলে মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পাবেন এবং ঘুমের চক্র উন্নত হবে।

এই তিনে মিলবে উপকার

• শরীরে ম্যাগনেশিয়ামের ঘাটতি পূরণ করতে খাদ্যতালিকায় কলা অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। কলায় শুধু ম্যাগনেশিয়াম নয়, প্রচুর পটাশিয়ামও রয়েছে। নিয়মিত কলা খেলে শরীরে এসব খনিজের ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব।

• দইকে আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী বলে মনে করা হয়। এটি কেবল আমাদের অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্যই ভালো নয়, বরং ঘুমের অভাব কাটিয়ে উঠতেও সাহায্য করতে পারে। যদি খাদ্যতালিকায় ১০০ গ্রাম কম চর্বিযুক্ত দই অন্তর্ভুক্ত করেন, তাহলে প্রায় ১৯ মিলিগ্রাম ম্যাগনেশিয়াম পাওয়া যাবে।

এর সঙ্গে আরও একটি কাজ করতে পারলে আপনার ঘুম ঠিক হতে থাকবে। সেটা হলো একটি পাত্রে ঠান্ডা পানিতে দুই পা ডুবিয়ে রাখুন ১০ থেকে ৩০ মিনিট। পানি স্বাভাবিক ঠান্ডাও হতে পারে অথবা পানিতে কয়েকটা বরফটুকরা দিয়ে একটু ঠান্ডা করে নিতে পারেন। ধীরে ধীরে ঠান্ডা বাড়তে থাকলে আপনার শরীরও ধীরে ধীরে ঠান্ডা হতে থাকবে। সেই সঙ্গে ঘুমের আবেশ তৈরি হয়ে ঘুম এসে যাবে।

ঘুম ভাল না হলে দিনভর থাকে ক্লান্তি

যদি চার থেকে ছয় সপ্তাহ এগুলো মেনে চলার পরও সমস্যা না কমে, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসক বা নিদ্রাবিশেষজ্ঞকে দেখান। কারণ, অনিদ্রার জন্য থাইরয়েড, স্লিপ অ্যাপনিয়া, ডিপ্রেশন, রেস্টলেস লেগ সিনড্রোম বা অন্য রোগও দায়ী থাকতে পারে। ওষুধ (স্লিপিং পিল) শুধু অল্প সময়ের জন্য নিতে পারেন কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে অভ্যাস হয়ে গেলে ক্ষতি করে।

লেখক: খাদ্য ও পথ্য বিশেষজ্ঞ প্রধান নিবার্হী, প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র

ছবি: পেকেজলসডটকম

Read full story at source