আগামী দিনের বই

· Prothom Alo

বই মানে এখন আর শুধু ছাপা বই নয়, পিডিএফ, ইপাবসহ রয়েছে নানা ধরনের ই-বুক। এসব ই-বুক পড়ার জন্য আছে ই-রিডার। আবার অডিও বুকও রয়েছে এখন। যত দিন যাচ্ছে, বদলে যাচ্ছে বইয়ের ধরন। ভবিষ্যতের বই কেমন হতে পারে, জেনে নিন...

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুরু হয়ে গেছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব। এই বিপ্লব আরও উসকে দিয়েছে করোনাভাইরাস। যাঁরা প্রযুক্তিপ্রেমী নন, গত কয়েক বছরে তাঁরাও প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছেন অনেকটা। সব মিলিয়ে একটা বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে গোটা বিশ্ব। এই বদলের হাওয়া লেগেছে বইয়ের জগতেও।

Visit bettingx.bond for more information.

এই হাওয়া কোথায় নিয়ে যাবে বইয়ের জগৎকে? এ প্রশ্নের সত্যিকার জবাব জানে না কেউই। তবে বাজার, প্রযুক্তির উন্নতির হার ইত্যাদি দেখে ধারণা করা যেতে পারে নিকট ভবিষ্যতের বই নিয়ে।

দেশ থেকেই শুরু করি। ১০ বছর আগেও বই মানে ছিল শুধু ছাপা বই। হার্ডকভার। অল্প কিছু পেপারব্যাক। আর ছিল পিডিএফ, বলা ভালো, অবৈধ ই-বুক। এ দেশে ই-বই প্রকাশের কথা কারও কল্পনায় ছিল বলে মনে হয় না। বিশ্ব অবশ্য তত দিনে পেরিয়ে গেছে পিডিএফের যুগ। পা দিয়েছে ইপাবে। এই ইপাব এখন চলে এসেছে বাংলাদেশেও। বিভিন্ন অ্যাপে পাওয়া যাচ্ছে বৈধ ই-বই। সব ইপাব। সুবিধাও অনেক পিডিএফের তুলনায়। ফন্ট বড়-ছোট করা, রং বদলে নেওয়া কিংবা এক ক্লিকে ছবি বড় করে দেখা পুরো স্ক্রিনে। ইংরেজিতে যাকে বলে কাস্টমাইজেবল। পাঠক নিজের মতো করে নিতে পারেন সবকিছু। দামও ছাপা বই থেকে অনেক কম।

মানুষ আর আগের মতো বই পড়ে না কেন
১০ বছর আগেও বই মানে ছিল শুধু ছাপা বই। হার্ডকভার। অল্প কিছু পেপারব্যাক। আর ছিল পিডিএফ, বলা ভালো, অবৈধ ই-বুক।

বিশ্ববাজারের দিকে যদি তাকাই, তাহলে আরও পেছনে ফিরতে হবে। পিডিএফের জগতে বিপ্লব এসেছিল প্রজেক্ট গুটেনবার্গের হাত ধরে। যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মিখায়েল হার্ট ১৯৭১ সালে শুরু করেছিলেন। বিপুল পরিমাণ বইয়ের পিডিএফ বানিয়ে উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন সবার জন্য। তারপর পিডিএফ থেকে ইপাবে আসার মাঝের সময়টায় বাজারে এল অ্যামাজন। ২০০৭ সালের ১৩ নভেম্বর যাত্রা শুরু করে তাদের ই-রিডার কিন্ডল। এই কিন্ডলের এখন একাধিক ভার্সন আছে। ২০২২ সালে বাজারে আসা কিন্ডল পেপারহোয়াইট এখন আরও উন্নত, আরও জনপ্রিয়। নিজস্ব ফরম্যাটও আছে অ্যামাজনের, এজিডব্লিউ (azw; একে এজেডডব্লিউও বলা হয়)। এটিও ইপাবের মতো, কাস্টমাইজেবল।

২০০৭ সালের ১৩ নভেম্বর যাত্রা শুরু করে ই-রিডার কিন্ডল

প্রযুক্তির ছোঁয়া ভবিষ্যতে শুধু ই-বইয়ের বিভিন্ন ফরম্যাটে সীমাবদ্ধ থাকবে না। কী রকম হবে সেসব বই? এ নিয়ে কাজ করেছে আইডিইও নামের বিখ্যাত এক ডিজাইন কোম্পানি। তাদের ধারণা প্রশংসিত হয়েছে পৃথিবীজুড়ে। বাস্তবায়নের চেষ্টাও শুরু হয়েছে।

এ রকম একটি ধারণা বা কনসেপ্টের নাম নেলসন কনসেপ্ট। ই-রিডারের ডিজাইনে তারা বাঁ পাশে সাইডবারের মতো একটি অংশ রেখেছে। ইতিহাস বা নন–ফিকশনের বই পড়ার সময় কোনো শব্দে ক্লিক করে তথ্যটি ঠিক আছে কি না (ফ্যাক্ট চেক) বা এ নিয়ে অন্তর্জালে কী কী ধরনের ভিন্নমত বা বিতর্ক আছে, তা দেখতে পারবেন পাঠক। আরও বিস্তারিত পড়তে পারবেন বিভিন্ন সূত্র থেকে।

আইনস্টাইনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল যে ৫ বই
২০২২ সালে বাজারে আসা কিন্ডল পেপারহোয়াইট এখন আরও উন্নত, আরও জনপ্রিয়। নিজস্ব ফরম্যাটও আছে অ্যামাজনের, এজিডব্লিউ বা এজেডডব্লিউও। এটিও ইপাবের মতো, কাস্টমাইজেবল।

আরেকটি ধারণার নাম কোপল্যান্ড কনসেপ্ট। অনেকে মিলে একসঙ্গে বই পড়া এবং এ বিষয়ে শেয়ার করার সুযোগ করে দেবে এটি পাঠককে। আপনার প্রতিষ্ঠানের বা বন্ধুদের কে কোন বইটি পড়ছেন, সেটা যেমন দেখতে পারবেন, সবাই মিলে শেয়ার্ড বুকসার্ভারও গড়ে তুলতে পারবেন চাইলে। তখন দলের একজন বইটি কিনলে বাকিদের আর কিনতে হবে না। ঠিক যেমন ছাপা বই ধার করে পড়েন বন্ধুরা বা ভালো লাগলে অন্যদের পড়তে বলেন, সে রকম।

অ্যালিস কনসেপ্ট নামের একটি ধারণায় আইডিইও দেখিয়েছে, পুরো বইয়ের জন্য চাইলে একটা টাইমলাইন বা ঘটনার সময়কাল তৈরি করা যায়। ই-বইয়ের নির্দিষ্ট বাটনে ক্লিক করে এই সময়কাল দেখা যাবে। নন-লিনিয়ার বা সরলরৈখিক নয়, এমন বর্ণনা পড়ে বুঝতে না পারলে পাঠক দেখতে পারবেন এই সময়কাল। ফিকশনে এটি বেশ কাজে লাগবে। পাশাপাশি বইয়ের বিভিন্ন চরিত্রের ইতিহাস, পছন্দ-অপছন্দ ইত্যাদি জানতে পারবেন পাঠক।

অ্যালিস কনসেপ্ট: জটিল বা সরলরৈখিক নয়, এমন ঘটনা প্রবাহের জন্য ধারাবাহিক সময়কাল তৈরি করে নেওয়া যাবে এতে

শুধু ই-বই নয়, প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগছে ছাপা বইতেও। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, অনেক বইতে ছবি, ভিডিও বা তথ্যসূত্র সংযুক্ত করা হচ্ছে কিউআর কোডের মাধ্যমে। পাঠক স্ক্যান করছেন কোড, চট করে দেখে নিতে পারছেন প্রয়োজনীয় রঙিন ছবি বা ভিডিও। তা ছাড়া ইলাস্ট্রেশনের জনপ্রিয়তাও বাড়ছে দিন দিন। এসব ইলাস্ট্রেশন হয়তো ভবিষ্যতে হয়ে উঠবে ইন্টারঅ্যাকটিভ। ধারণাটি বর্তমানে প্রয়োগ করা হচ্ছে শিশুদের বইতে। অক্ষর বা পশুপাখি পরিচয়ের অগমেন্টেড রিয়েলিটি বইতে আঁকা থাকে ছবি। নির্দিষ্ট অ্যাপে ঢুকে সেই ছবি স্ক্যান করলেই দেখা যায় টুডি বা থ্রিডি অ্যানিমেশন। জীবন্ত হয়ে ওঠে আঁকা ছবিগুলো। বাংলা ভাষায় এ রকম একটি বইয়ের নাম ‘লাইভ আঁকিবুঁকি’, প্রকাশিত হয়েছে আদর্শ থেকে।

যে ৫ কারণে প্রতিদিন বই পড়া উচিত
অ্যালিস কনসেপ্ট নামের একটি ধারণায় আইডিইও দেখিয়েছে, পুরো বইয়ের জন্য চাইলে একটা টাইমলাইন বা ঘটনার সময়কাল তৈরি করা যায়।

প্রযুক্তির আরেকটি বড় প্রয়োগ প্রিন্ট অন ডিমান্ড। আগে প্রতি সংস্করণে একটা নির্দিষ্টসংখ্যক কপি ছাপতেন প্রকাশকেরা। এখন পাঠকের চাহিদানুসারে ছাপা হচ্ছে। তাতে দীর্ঘদিন জমা করে রাখার সমস্যা কমে গেছে অনেকখানি। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের মতো বিখ্যাত প্রকাশনীও প্রযুক্তির এ সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। ফলে পুরোনো, দুষ্প্রাপ্য অনেক আউট অব প্রিন্ট চলে এসেছে পাঠকের হাতের নাগালে।

এসব পড়ার বিষয়। তবে বই এখন আর শুধু পড়ায় সীমাবদ্ধ নেই। বইপাড়ায় নতুন সংযোজন হিসেবে এসেছে অডিও বুক ও পডকাস্ট। অডিও বুকে পুরো বই পড়ার বদলে শুনতে পারবেন পাঠক। এ ধরনের বই ইউটিউবে যেমন প্রচুর আছে, তেমনি বিক্রি হচ্ছে অ্যামাজনের মতো ই-স্টোরগুলোতেও। আর পডকাস্টকে বলা যায়, ঠিক বই নয়, ব্লগের অডিও ভার্সন। পাঠক চাইলে ডাউনলোড করে নিতে পারেন, আবার স্ট্রিমিংও করতে পারেন। এ জন্য স্পটিফাইয়ের মতো প্রিমিয়াম সার্ভিস যেমন আছে, তেমনি বিদেশি লেখকদের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটেও দেখা যাচ্ছে পডকাস্ট। ধারাবাহিক ব্লগের মতো, পর্বাকারে শোনা যায়। ফলে চোখ খুলে, হাতে বই ধরে পড়তে হবে না, মাথা খাটাতে হবে না। বাসে বা ট্রেনে যেতে যেতে কিংবা ঘুমানোর আগে চোখ বুজে শুয়ে শুনলেই হলো।

অডিও বুকে পুরো বই পড়ার বদলে শুনতে পারবেন পাঠক

এত এত প্রযুক্তি, তবু ছাপা বইয়ের বাজারে খুব বড় প্রভাব পড়েনি। পাঠক প্রযুক্তিবান্ধব হয়ে উঠছেন ঠিকই, কিন্তু ছাপার গ্রহণযোগ্যতা আর বই হাতে নিয়ে পড়ার অনুভূতির মূল্য আছে এখনো। আরেকটি বড় বিষয়, ই-বই হোক বা অডিও বুক, এগুলো শুধু নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পড়া বা শোনার সুযোগ পাওয়া যায়। মালিকানা বা নিজের করে পাওয়ার বিষয়টি থাকে না। এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ, ছাপা বই পাওয়া যায় নিজের মতো করে। আবার প্রযুক্তির কল্যাণে পাঠক ঘরে বসে ছাপা বই কিনছেন। অনলাইনে অর্ডার করে দিলে বই চলে আসছে ঘরে। এভাবে ছাপা বইয়ের বিক্রিও বাড়ছে নিয়মিত।

অর্থাৎ ছাপা বইকে এখনো ক্লে টেবিল বা প্যাপিরাসের স্ক্রলের মতো জাদুঘরে তোলার সময় আসেনি। শিগগির আসবে বলেও মনে হচ্ছে না।

ছাপা বই কি হারিয়ে যাবে
বই এখন আর শুধু পড়ায় সীমাবদ্ধ নেই। বইপাড়ায় নতুন সংযোজন হিসেবে এসেছে অডিও বুক ও পডকাস্ট। অডিও বুকে পুরো বই পড়ার বদলে শুনতে পারবেন পাঠক।

ই-রিডার

বইয়ের একধরনের বিকল্প ই-রিডার। আকারে ছোট ও হালকা, ঠিক বইয়ের মতো আরাম করে ধরে পড়া যায়। তবে বইয়ের মতো এতে কখনো লেখা ফুরায় না। এক গল্প শেষ হয়ে গেলে চট করে ডাউনলোড করে নেওয়া যায় নতুন কোনো গল্প।

ই-রিডারের পর্দায় শব্দগুলো ফুটিয়ে তোলা হয় ই-ইঙ্ক বা ই-কালি ব্যবহার করে। এটি ঠিক ভৌত বা বাস্তব কালির মতো কাজ করে। আমরা কালি দেখতে পাই। কারণ, এটা আশপাশের আলোকে প্রতিফলিত করে। ই-কালির ক্ষেত্রেও তা-ই হয়। এটি স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের পর্দা থেকে ভিন্ন। কারণ, ওসব পর্দা নিজেরাই আলো উৎপাদন করে। ফলে দীর্ঘ সময় তাকিয়ে থাকা যায় না। ই-কালি বা ই-রিডারের পর্দা নিজে আলো উৎপাদন করে না, বরং চারপাশের আলো প্রতিফলিত করে। ওই আলো চোখে এসে পড়লে আমরা ই-কালির লেখা দেখতে পাই।

ই-রিডারের পর্দায় শব্দগুলো ফুটিয়ে তোলা হয় ই-ইঙ্ক বা ই-কালি ব্যবহার করে

ই-রিডার ব্যবহারের সুবিধা

অনেকগুলো বই ডাউনলোড করে জমিয়ে রাখা ছাড়াও ই-রিডারের আরও সুবিধা আছে। অনেক ই-রিডার আবার টাচস্ক্রিন। শুধু স্পর্শ করে নোট রাখা যায়, আবার বন্ধুদের চাইলে প্রয়োজনীয় খুদে বার্তাও পাঠানো যায় চট করে। আবার লেখার আকার বা ফন্ট সাইজ বাড়িয়ে-কমিয়ে নেওয়া যায় পাঠকের সুবিধানুযায়ী। ফন্ট বদলেও নেওয়া যায় ইচ্ছেমতো। একদম আধুনিক ই-রিডারগুলোতে পর্দার চারদিকে ছোট এলইডি বাতি থাকে। এগুলো স্ক্রিনের দিকে ফেরানো থাকে। এই বাতিগুলো সামনে থেকে পর্দার লেখার ওপর আলো ফেলে, ফলে অন্ধকারেও পড়া যায়। কম্পিউটারের পর্দার পেছন থেকে যেমন আলো আসে, এগুলো সে রকম নয়। তাই আলোটা সরাসরি চোখে এসে পড়ে না। সে জন্য দীর্ঘ সময় এ ধরনের পর্দায় তাকিয়ে থাকলেও চোখে অস্বস্তি হয় না।

বই পড়ার সময় কল্পনায় ছবি ভেসে ওঠে কেন?
ই-রিডারের পর্দায় শব্দগুলো ফুটিয়ে তোলা হয় ই-ইঙ্ক ব্যবহার করে। এটি ঠিক ভৌত বা বাস্তব কালির মতো কাজ করে। আমরা কালি দেখতে পাই। কারণ, এটা আশপাশের আলোকে প্রতিফলিত করে।

যেভাবে কাজ করে

ই-কালি লেখা ফুটিয়ে তোলার জন্য কালো ও সাদা বিন্দুর নকশা ব্যবহার করে। এসব বিন্দু একধরনের কণা দিয়ে তৈরি। এই কণাগুলো থাকে স্ক্রিন বা পর্দার নিচে তেলভর্তি মাইক্রোক্যাপসুলের ভেতরে। প্রতিটি মাইক্রোক্যাপসুলের প্রস্থ একটি চুলের মতো।

এ রকম প্রায় আট লাখ মাইক্রোক্যাপসুল থাকে স্বচ্ছ পর্দা ও নিচের ইলেকট্রোডের মাঝখানে। প্রতিবার পৃষ্ঠা বদলালে ই-রিডার ইলেকট্রিক চার্জ হিসেবে একটা সিগন্যাল পাঠায় মাইক্রোক্যাপসুলগুলোর কাছে। এই সিগন্যাল অনুযায়ী আগের লেখাগুলো পর্দা থেকে চলে যায় এবং কণাগুলো নির্দিষ্ট বিন্যাসে বিন্যস্ত হয়ে নতুন লেখা ফুটিয়ে তোলে।

*লেখাটি ২০২৩ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় ফ্রেব্রুয়ারি সংখ্যায় প্রকাশিতবই পড়ার অভ্যাস আবার ফিরিয়ে আনবেন যেভাবে

Read full story at source