সিংহল সমুদ্র থেকে

· Prothom Alo

শুরু হয় যাত্রা সমুদ্রের নীল আহ্বানে। নেগোম্বোর নির্জন তট, মিরিসসার স্বপ্নময় সৈকত আর পলহেনার শান্ত জলরেখা বিস্ময়ে বিমুগ্ধ করে। অচেনা পথে ভোর জাগে, লবণাক্ত হাওয়ায় ভাসে গল্পের গন্ধ; পথের প্রতিটি বাঁকে মিশে থাকা সৌন্দর্যে মুছে যায় ক্লান্তি; অচেনার আনন্দে ডানা মেলে অগণন স্মৃতি।

শ্রীলঙ্কা এখন ট্যুরিস্টদের কাছে জনপ্রিয়তার শীর্ষে। সবাইকে টানে পাহাড়। অথচ শ্রীলঙ্কায় সমুদ্রের অপার্থিব সৌন্দর্যের কথা অনেকেরই অজানা। বাবার কাজের সূত্রে আমরা সম্প্রতি সেই অভিজ্ঞতা নিতে পেরেছি।

Visit rouesnews.click for more information.

কলম্বো এয়ারপোর্টে নেমেই হুড়োহুড়ি লেগে গেল। একটা লাগেজ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বেশ কিছুক্ষণ চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে থাকলাম। শখানেক হাত ঘুরে লাগেজ আমার সামনে এসে থামল। তুলে নিলাম। ততক্ষণে সিম কেনা হয়ে গেছে। আমাদের এখানে যেটা ‘পাঠাও’ বা উবার, শ্রীলঙ্কায় সেটা ‘পিক মি’। বুঝতে পারলাম সবই দৃষ্টিভঙ্গি! পিক মির মিনিভ্যান এয়ারপোর্ট থেকে বেরোতেই আমাদের তুলে নিল। গন্তব্য নেগোম্বো নামের একটি শহর। ঘুটঘুটে অন্ধকারে সমুদ্র দিয়ে ঘেরা সেই শহরের উদ্দেশে চললাম।

নেগোম্বো ফোর্ট

ড্রাইভার ভালো ইংরেজি বলতে পারে। দক্ষিণ ভারতীয়দের মতো কথার ধাঁচ। মিনিট চল্লিশ গাড়ি চালিয়ে আমাদের পৌঁছে দিলেন হোমস্টেতে। বাংলোর মতো একটা বাড়ি। বড় বড় রুম। তবে সে দেশের আবার কড়া নিয়ম; দুজনের বেশি এক রুমে থাকা মানা। অগত্যা দুই রুম নিয়েছি। ফ্রেশ হয়ে আগেভাগেই সাহ্‌রি করে শুয়ে পড়লাম। অন্ধকারে এত বড় বাড়িতে গা–ছমছমে অনুভূতি থেকে খানিকটা বাঁচতেই চেয়েছি হয়তো!

পরের দিন সকালে উঠেই আগে সমুদ্র। আমাদের বাংলো থেকে মিনিট দশেকের হাঁটা পথ। আমি বরাবরই সমুদ্র খুব ভালোবাসি। পাহাড় যে অপছন্দ, তা না। তবে পাহাড় চড়ায় আমার নেশা নেই। সমুদ্রই আমাকে টানে। ছোট্ট একফালি সৈকত। মানুষ নেই। ভীষণ নীল জল। একদম সীমানার মধ্য দিয়েই উড়ে যায় বকপক্ষী। দাঁড়িয়ে থাকে এক পা তুলে। পাশেই জেলেরা জাল থেকে মাছ ছাড়াচ্ছেন। একদম ছবির মতো মনে হচ্ছিল সব! তবে একটুকরা সমুদ্রে পা-ই ভেজানোর সুযোগ হলো শুধু। নামতে আর পারলাম না। হাতে সময় খুব কম। তড়িঘড়ি করে ছুটলাম ডাচ ফোর্ট আর জেলখানা দেখতে।

সেন্ট মেরি’জ চার্জ

ডাচ ফোর্টে গিয়ে হতাশই হলাম। দুর্গ তো নয়, এ যেন দুর্গের কঙ্কাল দাঁড়িয়ে আছে। এই আফসোস অবশ্য গল ডাচ কলোনিতে গিয়ে একেবারেই নাই হয়ে গেল। সে গল্প পরের জন্য তোলা থাক। মাঝে একটা গির্জাও দেখে নিলাম। সেইন্ট মেরি’জ চার্চ। স্থাপনার সময়কাল ১৮৭৭-৭৮ সালের দিকে। বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলাম সব। মিশনারি স্কুলে পড়ার সুবাদে চার্চে আগেও যাওয়া হয়েছে। তবে সম্প্রতি ফিলিপ লারকিনের ‘চার্চ গোয়িং’ পড়েছি। তাই আগ্রহটা এবার একটু বেশিই বলা চলে।

যখন বেরোচ্ছি চার্চের ঘণ্টা বাজছে। বুঝলাম বারোটা বাজে। তাড়া ছিল; তবু রাস্তা ধরে বেশ খানিকক্ষণ হেঁটেও বেড়ালাম। গিবলি সিনেমার মতো ঝকঝকে রাস্তাঘাট, পরিষ্কার নীল আকাশ। মন ভালো হয়ে গেল। হোটেলে ফিরেই তল্পিতল্পা গুছিয়ে এবার আসল সমুদ্রে যাওয়ার পালা। এবারের গন্তব্য ‘মিরিসসা’। রিভিউতে অনেকেই একে এ দেশের সবচেয়ে সুন্দর সমুদ্রসৈকত বলে দাবি করেন।

অনেকের কাছেই মিরিসসার সৈকত সবচেয়ে সুন্দর

মিনিভ্যান নিয়ে প্রথমে চলে যেতে হবে মাতারা। প্রথমে দূরপাল্লার বাসে চলে গেলাম মাতারা। মাতারা বাসস্ট্যান্ড থেকে লোকাল বাস নিয়ে মিরিসসা যেতে যেতে আবারও রাত হয়ে গেল। এবার অবশ্য থাকলাম গেস্ট হাউসে। নাম ‘সুরিয়া গেস্ট হাউস’। বিচ থেকে কেবল মিনিট দশেক হাঁটার দূরত্বে। ফ্রেশ হয়েই চলে গেলাম সমুদ্রে পা ভেজাতে। মিরিসসার যে ‘ল্যান্টার্ন বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট’–এর ভক্ত পুরো ইনস্টাগ্রাম, সেটা সমুদ্রের পাড়ে দেখে চোখ কপালে। এত সুন্দর! পুরোই পরির দেশের দৃশ্য বলে মনে হচ্ছিল। বেশ অনেকক্ষণ বিচে থেকে ফিরে এলাম।

ফেরার পথে ‘শ্রী শপ’ নামের সুভ্যেনির দোকান ঘুরে টুকিটাকি কেনাকাটাও সেরে নিলাম। এ দেশের ১৫০০ টাকা আমাদের ছয় শ টাকারও কম। প্রথম কদিন প্রাইস ট্যাগ দেখে আঁতকে উঠেছি। পরে অবশ্য অভ্যাস হয়ে গেছে।

এটাই সেই সিক্রেট বিচ

পরদিন সকালে একই বিচে আবার গেলাম। এবার সমুদ্রে ভেজার প্রস্তুতি নিয়ে গিয়েছিলাম। ভেজা কাপড়েই আমার ভাইয়ের খেয়াল চাপল ‘সিক্রেট বিচ’–এ যাওয়ার। বেশ অনেকক্ষণ পাহাড়ি রাস্তায় উঠে অবশেষে সমুদ্রের দেখা পেলাম। পাহাড়ি ঢালু রাস্তায় হেঁটে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম বেশ। রাস্তায় অবশ্য পাহাড়ি জবাফুল, আর একবার ময়ূরেরও দেখা পাই। সমুদ্রের দেখা পেয়ে ক্লান্তি চলে গেল। কাব্য করে বলছি না। সমুদ্রের পানি এত স্বচ্ছ! ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতে একটা সমুদ্রের পেইন্টিং ছিল। পাথরে, প্রবালে সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে। বিচটা ঠিক সেই ছবির মতো দেখতে। কয়েকজন বিদেশি তীরের কাছেই অল্প পানিতে ভেসে আছেন। আমারও খুব ইচ্ছে হলো। কিন্তু সাঁতারটা আজও জানি না বলে অল্প একটু গা ভিজিয়েই মনকে মানাতে হলো।

মিরিসসায় দুদিন ছিলাম। মাঝে এক দিন গল ফোর্ট ঘুরে এলাম। সেখানেও ছোট একটা বিচ আছে। দূর থেকে একটা পাহাড় দেখা যায়। স্থানীয় একজন বললেন, সীতাকে উদ্ধার করতে এসে হনুমান এই পাহাড়ই নাকি হাতে করে উঠিয়ে নিয়ে এসেছিলেন! গলে সমুদ্রের চেয়েও বেশি ভালো লাগল দুর্গ। পুরো এলাকাটাই যেন পুরোনো দিনের চিহ্ন বয়ে চলছে। কোকোনাট বিচে বসে ভারত মহাসাগরের তীরে এক দিন ইফতার করেছি। এরপর সূর্যাস্ত দেখলাম। এমন অপার্থিব সুন্দর অভিজ্ঞতা বোধ হয় আমার আগে হয়নি।

তিমি দর্শনের চেষ্টায় লেখক

দ্বিতীয় দিন খুব সকালে উঠে চলে গেলাম তিমি দেখতে। মিরিসসাতে যাঁরা বেড়াতে আসেন, প্রায় সবার টু-ডু লিস্টে নাকি এটা থাকেই। সুতরাং টিকিটের দাম বেশ চড়া হলেও আমরা একটু ইতস্তত করে চলেই গেলাম। ভারত মহাসাগরের ঠিক মাঝে নিয়ে যাওয়া হলো ছোট এক লঞ্চে করে। সহযাত্রীরা সবাই ইউরোপীয়। ভারতীয়, এমনকি এশীয়ও কেউ ছিলেন না। অনেকক্ষণ তিমি তো দূরে থাক, একটা মাছও দেখতে না পেয়ে হতাশই লাগল। তবে ভাগ্য সেদিন সঙ্গে ছিল। আমরা বেশ কয়েক দল ডলফিন, কচ্ছপ এবং দু–দুবার তিমিরও দেখা পাই!

মিরিসসার পরে মাতারা থেকে খানিকটা দূরে পলহেনা নামে একটা বিচের কাছে ছিলাম। পলহেনা একটা ছোট্ট বিচ। মিরিসসার মতো এত বড় নয়। যেন বাড়ির পাশে ইছামতীর মতোই একফালি সমুদ্র। এ বিচে বিদেশিদের আনাগোনাও কম। প্রায় সবাই স্থানীয়। এই বিচে বেশ ভিজেছি।

বাবা–মা ও আমি ভাইয়ের সেলফিতে

সূর্যাস্ত দেখেছি। সি-ফুডও খেয়েছি। এই অবশ্য রাবণের দেশে আমার ঘোরা শেষ সমুদ্রসৈকত। এরপরই মাতারা থেকে বাসে চড়ে চলে আসি রাজধানী কলম্বোতে। আর পরের ঘোরা শুধুই পাহাড়ে।

আচ্ছা কবি জীবনানন্দ দাশ কি কখনো ‘সিংহল সমুদ্র’ দেখেছেন?

পলহেনা বিচে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বারবারই মনে হচ্ছিল, আচ্ছা, জীবনানন্দ দাশ ‘সিংহল সমুদ্র থেকে মালয় সাগরে...’ চলে গিয়েছেন কবিতায়, সত্যি কোনো দিন সিংহল সমুদ্র দেখার সৌভাগ্য কি তাঁর হয়েছিল?

ছবি: লেখক

Read full story at source