যুদ্ধবিরতি নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পাকিস্তানে সংলাপের প্রস্তুতি
· Prothom Alo
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতিতে রাজি হলেও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইসরায়েল। যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার পরও লেবাননে ব্যাপক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। ইসরায়েলের এমন নৃশংসতায় যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে তেহরান-ওয়াশিংটন সংলাপের প্রস্তুতি চলছে।
যুদ্ধবিরতি চলবে দুই সপ্তাহ। এর মধ্যে আজ শুক্রবার ইসলামাবাদে সংলাপ শুরু হচ্ছে। আনুষ্ঠানিক আলোচনা হবে আগামীকাল শনিবার। মোটামুটি এটুকু নিশ্চয়তা পাওয়া গেলেও সংলাপে তেহরান ও ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে কারা অংশ নেবেন, তা গতকাল বৃহস্পতিবার রাত পৌনে একটায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত জানা যায়নি। যদিও সংবাদমাধ্যমগুলোয় সম্ভাব্য কিছু নাম এসেছে।
Visit newsbetting.bond for more information.
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি হত্যার ৪০ দিন পূর্তিতে শোক সমাবেশ। বৃহস্পতিবার তেহরানেএরই মধ্যে শান্তিপ্রক্রিয়া ভেস্তে যায় কি না, সে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা। কারণ, ইরানের যে ১০ দফা প্রস্তাবের ভিত্তিতে সংলাপ শুরু হওয়ার কথা, তার তিনটি লঙ্ঘিত হয়েছে বলে দাবি করেছে তেহরান। যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী হরমুজ প্রণালিও পুরোপুরি চালু হয়নি। এ ছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে হুমকি দিয়েছেন—চুক্তি না হলে আরও বড় পরিসরে হামলা চালাবেন। আর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেছেন, ইরান যুদ্ধ চায় না, কিন্তু তার অধিকারের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেবে না।
এমন সব আলোচনার মধ্যে গতকাল রাতে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন জানান, ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন তাঁরা। ‘লেবাননের আহ্বানের’ পরিপ্রেক্ষিতে আলোচনা শুরু করতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও। অবশ্য নেতানিয়াহুর এমন বক্তব্যের পরপরই ইসরায়েলের প্রতিরক্ষমন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ জানিয়ে দেন, ‘যুদ্ধ থামবে না।’
ইসরায়েলের হামলায় ধ্বংসস্তূপের মধ্যে চলছে তল্লাশি। বৃহস্পতিবার লেবাননের তিয়ার শহরেজাতিসংঘে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন মালিহা লোদি। আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনার সময় ইসলামাবাদকে ওয়াশিংটন আশ্বাস দিয়েছিল যে ইসরায়েলকে বুঝিয়ে হামলা বন্ধ করবে তারা। যুদ্ধবিরতি শুরুর পর তার বিপরীতটাই দেখা যাচ্ছে। যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধে এখন পর্যন্ত যতটা অনিশ্চয়তা দেখা যাচ্ছে, তার জন্য ইসরায়েল দায়ী।
সংলাপ ঘিরে ইসলামাবাদে তোড়জোড়
যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আগামীকালের আনুষ্ঠানিক বৈঠককে বলা হচ্ছে ‘ইসলামাবাদ সংলাপ’। এ সংলাপ ঘিরে নানা কারণে অনিশ্চয়তা থাকলেও ইসলামাবাদে ব্যাপক তোড়জোড় চলছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের নিরাপত্তার জন্য রাজধানী শহরটিতে গতকাল ও আজ দুই দিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তা। লকডাউন করা হয়েছে বিভিন্ন এলাকা।
পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডন জানিয়েছে, মার্কিন প্রতিনিধিরা আজ ইসলামাবাদে পৌঁছাতে পারেন। এর আগে নিরাপত্তাব্যবস্থা খতিয়ে দেখতে দেশটির ৩০ সদস্যের দল ইসলামাবাদে পৌঁছেছে। ইরানি প্রতিনিধিরাও পাকিস্তানে যাবেন বলে জানিয়েছেন ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদেহ। লেবাননে হামলা বন্ধের ওপর জোর দিয়ে গতকাল রাতে তিনি বলেন, ‘আগামী কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে হুমকি দিয়েছেন-চুক্তি না হলে আরও বড় পরিসরে হামলা চালাবেন। আর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেছেন, ইরান যুদ্ধ চায় না, কিন্তু তার অধিকারের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেবে না।
দুই দেশের প্রতিনিধিদলে কারা থাকছেন, সে সম্পর্কে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, সংলাপে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার অংশ নিতে পারেন। ইরানের প্রতিনিধিদলে থাকতে পারেন দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিদ তাখত-রাভানচি।
এ সংলাপ নিয়ে নানা অনিশ্চয়তা থাকলেও জেডি ভ্যান্সের একটি বক্তব্য আশার আলো দেখাচ্ছে। রয়টার্সকে তিনি বলেছেন, একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য তাঁকেসহ পুরো আলোচক দলকে ‘সৎ বিশ্বাস’ নিয়ে আলোচনা করতে বলেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এখন ইরানও যদি সৎভাবে আলোচনা করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাস—একটি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
যুদ্ধবিরতির জন্য ট্রাম্পই মরিয়া হয়ে পাকিস্তানকে চাপ দিয়েছিলেন: এফটির প্রতিবেদনতবু হুমকি ট্রাম্প-হেগসেথের
জেডি ভ্যান্স হয়তো ট্রাম্পের ইতিবাচক বক্তব্য তুলে ধরেছেন, তবে নিজ মুখে কিন্তু নেতিবাচক কথা বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখেছেন, একটি ‘প্রকৃত চুক্তি’ সম্পূর্ণভাবে কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত মার্কিন বাহিনী ইরান ও দেশটির আশপাশে থাকবে। আর চুক্তি না হলে এমন হামলা চালানো হবে, যা আগে কখনো কেউ দেখেনি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পফাইলএ প্রকৃত চুক্তিটি আসলে কী, তা খোলাসা করেননি ট্রাম্প। তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগেসেথও উসকানি দিয়ে গতকাল সাংবাদিকদের বলেছেন, ইসলামাবাদ সংলাপের অন্যতম প্রধান শর্ত হতে হবে ইরানের পরমাণু ইস্যু। তেহরানকে ইসফাহান পরমাণুকেন্দ্রে মজুত ৪৪০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ করা ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করতে হবে। না হলে যুক্তরাষ্ট্র দেশটিতে গিয়ে তা নিয়ে আসবে।
—মালিহা লোধি, জাতিসংঘে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূতযুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনার সময় ইসলামাবাদকে ওয়াশিংটন আশ্বাস দিয়েছিল যে ইসরায়েলকে বুঝিয়ে হামলা বন্ধ করবে তারা। যুদ্ধবিরতি শুরুর পর তার বিপরীতটাই দেখা যাচ্ছে। যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধে এখন পর্যন্ত যতটা অনিশ্চয়তা দেখা যাচ্ছে, তার জন্য ইসরায়েল দায়ী।ইরানে আবার ব্যাপক হামলা শুরু করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে মার্কিন বিশ্লেষকেরাই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট সুজান ম্যালোনি নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে বিশ্ব অর্থনীতি নাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে ইরান। ট্রাম্প বিষয়টি ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছেন। তাই চাইলেই তিনি হুট করে আবার যুদ্ধে ফিরতে পারবেন না।
‘ট্রাম্পের চাপে’ আলোচনার সিদ্ধান্ত
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের মতো ইসরায়েলে যুদ্ধবিরোধী জনমত নেই। চলতি বছরের শেষে আবার ইসরায়েলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বিরোধী দলের নেতা ইয়ার লাপিদ যুদ্ধবিরতির জন্য নেতানিয়াহুর কড়া সমালোচনা করেছেন। এমনকি যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত ‘ভুল’ বলে উল্লেখ করেছেন সরকারি দল লিকুদ পার্টির নেতা আমিচাই চিকলি।
এ পরিস্থিতিতে দেশে রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে থাকতে যুদ্ধবিরতির মধ্যে নেতানিয়াহু লেবাননে হামলা চালাতে পারেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। গত বুধবার লেবাননজুড়ে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের পর গতকালও দেশটির বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এদিন লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর প্রধানের ব্যক্তিগত সহকারী আলী ইউসুফ হারশিকে হত্যার দাবি করেছে ইসরায়েলি বাহিনী।
যুদ্ধবিরতি করে ইরান যুদ্ধ এড়ালেন ট্রাম্প, তবে দিতে হচ্ছে চড়া মূল্যইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুএমন হামলার মধ্যে লেবাননের সঙ্গে নেতানিয়াহু কেন আলোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? মার্কিন এক কর্মকর্তার বরাতে সিএনএন জানিয়েছে, বুধবার ট্রাম্পের সঙ্গে কথা হয় নেতানিয়াহুর। তখন লেবাননে হামলা কমানো এবং হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করা নিয়ে দেশটির সঙ্গে আলোচনা শুরুর নেতানিয়াহুকে নির্দেশ দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তারপরই আলোচনার কথা বলেন নেতানিয়াহু।
বিরোধী দলের নেতা ইয়ার লাপিদ যুদ্ধবিরতির জন্য নেতানিয়াহুর কড়া সমালোচনা করেছেন। এমনকি যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত ‘ভুল’ বলে উল্লেখ করেছেন সরকারি দল লিকুদ পার্টির নেতা আমিচাই চিকলি।
লেবাননে হামলা থামিয়ে দেশটিকে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে যুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইতালি, স্পেন ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য। আর লেবাননে হামলা যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। এর আগে তেহরানের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল, যুদ্ধবিরতির পর লেবাননে হামলা, ইরানের ভূখণ্ডে ড্রোনের অনুপ্রবেশ এবং তেহরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ না করতে দেওয়ার মার্কিন হুমকির মাধ্যমে তাদের ১০ দফা প্রস্তাবের লঙ্ঘন হয়েছে।
শিগগিরই স্বাভাবিক হবে না হরমুজ
যুদ্ধবিরতির পর আল-জাজিরাকে সূত্র জানিয়েছিল, বৃহস্পতি বা শুক্রবার (আজ) থেকে হরমুজ প্রণালি চালু করতে পারে ইরান। এর পরপরই ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরস (আইআরজিসি) জানায়, লেবাননে হামলা চলমান থাকায় প্রণালিটি খুলবে না তারা। অবশ্য গতকাল বাহিনীটি হরমুজ দিয়ে চলাচলের জন্য একটি মানচিত্র প্রকাশ করেছে। এতে প্রণালির কোথায় মাইন স্থাপন করা আছে, তা উল্লেখ করা হয়েছে।
যদিও সমুদ্র গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কপলারের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পর ২৪ ঘণ্টায় হরমুজ দিয়ে মাত্র একটি জ্বালানি তেলবাহী ট্যাংকার ও পাঁচটি মালবাহী জাহাজ পার হয়েছে। নয়াদিল্লিভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সোসাইটি ফর পলিসি স্টাডিজের পরিচালক উদয় ভাস্কর বলেন, যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে দিনে প্রায় ১৩৫টি জাহাজ চলাচল করত। বর্তমান পরিস্থিতি মোটেও ভালো নয়।
হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে রেখে কি ট্রাম্পকে নতিস্বীকার করাল ইরানযুদ্ধবিরতির পর ২৪ ঘণ্টায় হরমুজ দিয়ে মাত্র একটি জ্বালানি তেলবাহী ট্যাংকার ও পাঁচটি মালবাহী জাহাজ পার হয়েছেএর কারণ হিসেবে একটি পর্যবেক্ষণ দিয়েছে কপলার। প্রতিষ্ঠানটির মতে, যুদ্ধবিরতি শুরু হলেও বেশির ভাগ জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান কিছু বিষয় বিবেচনা করছে। যেমন নিরাপত্তা ও বিমাসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা থাকায় তারা উল্লেখযোগ্য হারে ঝুঁকি নিতে ইচ্ছুক নয়। এ ছাড়া হরমুজ দিয়ে চলাচল করা জাহাজ থেকে ইরান যে বাড়তি অর্থ নেওয়ার কথা বলেছে, তা-ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিবেচনায় রয়েছে। তাই ধারণা করা হচ্ছে, যুদ্ধবিরতি হলেও এ সময়ে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫টি জাহাজ হরমুজ দিয়ে চলাচল করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির ঠিক আগের মুহূর্তগুলোতে কী হয়েছিল