জসীমউদ্দীনের দায় ও দরদ
· Prothom Alo

‘পৃথিবী থেকে ধীরে ধীরে নক্সী কাঁথার মাঠ অবলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, মুছে যাচ্ছে আলপনার দিন, নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে পুঁথি পাঠের আসর এবং বিদায় নিচ্ছে এসব সনাতন ধারার বাহক বহু শিল্পী, কবি এবং সাহিত্যিক’—এই চিরায়ত সত্যগুলো নতুন করে মনের ভেতর মোচড় খেয়ে ওঠে পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের পঞ্চাশতম তিরোধান দিবসে। আজ থেকে ৫০ বছর আগে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন।
Visit xsportfeed.quest for more information.
জসীমউদ্দীনের জন্মস্থান ফরিদপুরেই আমার জন্ম। তাঁর সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটে শৈশবে পাঠ্যপুস্তকের পাতায়। ‘কবর’ কবিতার প্রথম আটলাইন মুখস্থ করা অথবা ‘নিমন্ত্রণ’ শব্দার্থ লেখা—এই ধরনের প্রথাগত পড়াশোনার মধ্য দিয়েই জসীমউদ্দীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা। কবি কিংবা কবিতা নিয়ে ভাবার বয়স হয়নি। শুধু ‘কবর’ কবিতা সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত থাকায় বারবার পড়তে হয়েছে। এ কবিতার সঙ্গে নিদারুণ কষ্টের এক গল্পের আমেজ থাকায় আরও বেশি করে পড়া হয়েছে।
বেদের মেয়ের ছোট বাইদানির কষ্টে মা কাঁদতেন। চোখের কান্না কখনো মিথ্যা হয় না। সত্যি সত্যিই জসীমউদ্দীনও মানুষকে কাঁদাতে পারতেন। নিজেও ব্যক্তিজীবনে সহজ-সরল ছিলেন। বিচারগান-দেহতত্ত্ব গান শুনে হাউমাউ করে কাঁদতেন।
এরপর মধুমালা, বেদের মেয়ে, সোজন বাদিয়ার ঘাট, রাখালী ও নক্সী কাঁথার মাঠ–এর সঙ্গে পরিচয় ঘটে ধীরে ধীরে। জসীমউদ্দীনকে চেনার–জানার পথটিকে সহজ করেছিলেন আমার মা। মায়ের একটি ‘এনইসি’ ট্রানজিস্টার ছিল। সপ্তাহে কোন কোন দিন কোন সেন্টারে কী নাটক হবে, তা ছিল আমার মা ও নানির মুখস্থ। বেদের মেয়ের ছোট বাইদানির কষ্টে মা কাঁদতেন। চোখের কান্না কখনো মিথ্যা হয় না। সত্যি সত্যিই জসীমউদ্দীনও মানুষকে কাঁদাতে পারতেন। নিজেও ব্যক্তিজীবনে সহজ-সরল ছিলেন। বিচারগান-দেহতত্ত্ব গান শুনে হাউমাউ করে কাঁদতেন।
১৯৭৪ সালে ঢাকার কমলাপুরের বাড়িতে জসীমউদ্দীন (১ জানুয়ারি ১৯০৩—১৪ মার্চ ১৯৭৬)কবি জসীমউদ্দীনের পাঠক সংখ্যা যেমন অনির্ধারিত, তেমনি বর্ধিষ্ণু। তাঁর পাঠকেরা তাঁকে পল্লীকবি হিসেবেই চিনে আসছেন। তারা নিঃসন্দেহে লক্ষ করেছেন যে কবি শুধু কবিতাই লেখেননি, একদিকে কবি–সাহিত্যিকদের অনুকূলে পারিপার্শ্বিকতা সৃষ্টি ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন আর অন্যদিকে সমাজকে কলুষতা ও শোষণমুক্ত রাখতে দিয়েছে নতুন পথের সন্ধান। লেখকদের নিয়ে পাঠকদের সচেতনতার কথা উল্লেখ করতে গিয়ে ‘আরো বই পড়ুন’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, ‘আপনারা বই কিনলে আরও কী হবে জানেন, দেশের লেখকেরা বই বিক্রি থেকে পয়সা পাবেন। দেশে একদল স্বাধীন মতের লেখক তৈরি হবে। তখন তাঁরা যা ভাববেন, তা–ই লিখতে পারবেন। দেশের অধিকাংশ লেখককে যদি জীবিকার জন্য কোনো সরকারের চাকরি করতে হয়, তবে সেই সরকার কোনো অবিচার করলেও লেখক সোচ্চার হতে পারেন না। লেখক স্বাবলম্বী হলে সে তো আপনারই লাভ। সরকারের সমালোচনা করে আপনাকে তবে জেলে যেতে হবে না। লেখকের বইগুলো সেই কাজ করবে। রুশো, ভলতেয়ারের লেখাগুলো তাঁদের দেশে মহাপরিবর্তন এনেছিল।’
কবি জসীমউদ্দীন ছিলেন সামগ্রিক বাংলা সাহিত্যে এক বিস্ময়কর কবি। তাঁর সৃষ্টিকর্মের স্বভাব ও মেজাজ সমসাময়িক কালের জন্য কবিদের থেকে তাঁকে করেছে স্বতন্ত্র, স্বাধীন ও বিচিত্র বিভায় আলোকিত। তাঁর সব রচনা আমাদের এক অলৌকিক গ্রামবাংলার দিকে ধাবিত করে এবং নিয়ে যায় মাটি ও মানুষের খুব কাছাকাছি। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের বিশালত্বের বলয় থেকে বেরিয়ে জসীমউদ্দীন এক নতুন ঘরানার জন্ম দিয়েছেন বাংলা কবিতায়; কিন্তু এই দুজনের দেশাত্মবোধ, দেশপ্রেম ও রাজনৈতিক সচেতনতার চেয়ে জসীমউদ্দীনের দেশপ্রেম ও রাজনৈতিক সচেতনতা কোনো অংশেই কম ছিল না। তাঁকে পল্লীকবি মাটি ও মানুষের কবি, গ্রামবাংলার কবি, আবার অনেকে গেঁয়ো কবিও বলেছেন। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা ও দেশাত্মবোধে লেখাগুলো ছিল অত্যন্ত আধুনিক ও সমাজমনস্ক।
কেবল সাহিত্যে নয়, ব্যক্তিজীবনেও তিনি ছিলেন দেশবাসীর এক আপনজন। তাঁর চিন্তা-চেতনা ছিল সুগভীর এবং কল্যাণমুখী। অনাকাঙ্ক্ষিত এবং গণবিরোধী শক্তিকে কবি আমৃত্যু ঘৃণা করেছেন মনে-প্রাণে।
সাহিত্য ও এদেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে তিনি একাকার হয়ে গিয়েছিলেন। মানুষের জীবন ও সংগ্রাম থেকে নিজেকে তিনি বিচ্ছিন্ন করেননি। কেবল সাহিত্যে নয়, ব্যক্তিজীবনেও তিনি ছিলেন দেশবাসীর এক আপনজন। তাঁর চিন্তা-চেতনা ছিল সুগভীর এবং কল্যাণমুখী। অনাকাঙ্ক্ষিত এবং গণবিরোধী শক্তিকে কবি আমৃত্যু ঘৃণা করেছেন মনে-প্রাণে। প্রতিক্রিয়াশীলদের প্রতি তার বিরূপ অভিব্যক্তি সাহিত্যকর্মে প্রকটভাবে প্রকাশিত না হলেও ব্যক্তিজীবনে তার কমতি ছিল না।
কবি ভাষার প্রশ্নে ছিলেন একজন সংগ্রামী সৈনিক। একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকার ভাষাসৈনিক ছাত্র-জনতার বুক শাসকদের বুলেটে ছিদ্র হলো। রক্তে লাল হলো ঢাকার রাজপথ। কবির মনে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠল। ঢাকার ইডেন বিল্ডিং বর্তমান সচিবালয়ের কর্মচারীদের কক্ষে কক্ষে গিয়ে চিৎকার করে বললেন, ‘আমাদের ভাইয়েরা ভাষার জন্য প্রাণ দিচ্ছে আর আপনারা চেয়ারে বসে আছেন? আপনারা সবাই বেরিয়ে আসুন।’ সেক্রেটারিয়েটের সব কর্মচারীকে নিয়ে কবি রাজপথে মিছিল করলেন, স্লোগান দিলেন খুনি সরকারের বিরুদ্ধে। কবি মনে-প্রাণে ছিলেন প্রগতিশীল। প্রগতিশীল চিন্তার শুধু ধারকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ বাহক। রাজনৈতিক সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত না হয়েও প্রগতিশীল কর্মকাণ্ডে তাঁর উপস্থিতি ছিল বিশেষভাবে লক্ষণীয়। যে দেশে মানুষ বড়ো বড়ো গ্রন্থটি তিনি কমিউনিস্ট নেতা মণি সিংকে উৎসর্গ করেছিলেন।
মানুষের জাগতিক দুঃখের রূপকার ছিলেন কবি জসীমউদ্দীন। গ্রামবাংলার হিন্দু-মুসলমান উভয় সমাজের জীবনপ্রবাহ তিনি উপস্থাপন করেছেন সমান দরদ দিয়ে। লোক-জীবন থেকে সংগ্রহ করেছেন তাঁর কাব্যের উপকরণ।
কবি জসীমউদ্দীনের মতো করে গ্রামের আলপথে, ধানখেতে, গ্রামের রোদ হাওয়া গায়ে মেখে বেদেবহরের হাসি-কান্নায় সুর মেলাতে আর কোনো কবি আবার কখনো বাংলায় আসবেন কি না, তা ভবিষ্যৎই বলতে পারে। কেননা, পৃথিবী থেকে ধীরে ধীরে নক্সী কাঁথার মাঠ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে মাটির গন্ধমাখা উদার মনমানসিকতা। আসুন, জসীমউদ্দীনের কাব্যের ভুবনে ফিরে যাই, যেখানে দল নয়, মানুষ বড়। কবির প্রতি রইল শুধু শ্রদ্ধাঞ্জলি।