প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার প্রতিফলন

· Prothom Alo

কুমিল্লার পদুয়া বাজার রেলক্রসিংয়ে গত শনিবার রাতে ট্রেনের সঙ্গে যাত্রীবাহী বাসের সংঘর্ষে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও অনেকে। ঈদের ছুটির মধ্যে এ দুর্ঘটনা সবাইকে শোকাহত করেছে। আমরা মনে করি, এটা শুধু দুর্ঘটনা নয়, আমাদের রেলব্যবস্থার দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার প্রতিফলন।

Visit livefromquarantine.club for more information.

প্রাথমিক তদন্তে গেটম্যানের গাফিলতির কথা উঠে এসেছে। দুই গেটম্যানকে বরখাস্ত করা হয়েছে, স্টেশনমাস্টারের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তদন্ত করে প্রতিটি ঘটনায় ব্যর্থতার জন্য দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশ্বস্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরই মধ্যে রেলক্রসিংয়ের দুই কর্মীকে আসামি করে মামলাও হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এতেই কি দায় শেষ?

প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, গত আট বছরে শুধু পূর্বাঞ্চল রেলওয়েতেই ৮টি বড় দুর্ঘটনায় ৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ২১৮ জন। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর একই দৃশ্য—তদন্ত কমিটি গঠন, দায়ী হিসেবে নিচের সারির কয়েকজন কর্মীকে চিহ্নিত করা এবং কিছু প্রশাসনিক ব্যবস্থা। কিন্তু দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি থেমে নেই। এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে, সমস্যাটি ব্যক্তিগত গাফিলতির চেয়ে বড়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রেলওয়ের তদন্তপ্রক্রিয়াই এখানে প্রশ্নবিদ্ধ। অধিকাংশ তদন্ত কমিটি গঠিত হয় রেলের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তাদের দিয়ে। ফলে তাঁরা প্রায়ই সহকর্মীদের দায় এড়িয়ে যান। নিচের স্তরের কর্মীদের শাস্তি দিয়ে দায়সারা হয়, কিন্তু নীতিনির্ধারণী বা ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে কোনো জবাবদিহি তৈরি হয় না। এ ধরনের ব্যবস্থা শুধু অন্যায্য নয়, অকার্যকরও বটে। কারণ, এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে, একজন গেটম্যান কেন ভুল করেন? তিনি কি পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ পেয়েছেন? তাঁর কাজের পরিবেশ কেমন? তিনি কি নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন? তাঁর ওপর তদারকি কতটা কার্যকর? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা ছাড়া কেবল শাস্তি দিয়ে দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব নয়।

অধ্যাপক মো. সামছুল হক যথার্থই বলেছেন, যত দিন পর্যন্ত উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা না যাবে, তত দিন দুর্ঘটনা বন্ধ হবে না। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও তা–ই বলে। অনেক দেশে বড় দুর্ঘটনার পর শীর্ষ কর্মকর্তারা দায়িত্ব স্বীকার করে পদত্যাগ করেন। এতে শুধু দায় নির্ধারণই হয় না, ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্ত বার্তাও যায়। বাংলাদেশে সেই সংস্কৃতি এখনো গড়ে ওঠেনি।

সরকার অবশ্য কিছু উদ্যোগের কথা বলছে। রেলক্রসিংয়ে আন্ডারপাস বা ওভারপাস নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। দুর্ঘটনার পরপরই তদন্ত কমিটি গঠন, আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে সহায়তার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এগুলো প্রয়োজনীয়, কিন্তু যথেষ্ট নয়। কারণ, সমস্যা শুধু অবকাঠামোগত নয়, প্রাতিষ্ঠানিকও।

রেলক্রসিংগুলো এখনো বাংলাদেশের দুর্ঘটনার অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ স্থান। অনেক জায়গায় সঠিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা নেই, গেটম্যানের ওপরই নির্ভর করতে হয়। প্রযুক্তিনির্ভর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু না করলে এই ঝুঁকি কমবে না। একই সঙ্গে কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত জনবল এবং আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রয়োজন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বাধীন তদন্তব্যবস্থা। রেলওয়ের ভেতরের লোক দিয়ে তদন্ত না করে একটি স্বতন্ত্র সংস্থা দিয়ে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি। এতে প্রকৃত দায় নির্ধারণ সহজ হবে। বর্তমান সরকারের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। তারা কি আগের মতোই নিচের সারির কর্মীদের শাস্তি দিয়ে দায় শেষ করবে, নাকি একটি টেকসই ও কাঠামোগত পরিবর্তনের পথে হাঁটবে—এখন সেটিই দেখার বিষয়।

ঈদ বা এ রকম কোনো উৎসবের সময় যখন মানুষ বাড়ি ফেরার আনন্দে থাকে, তখন এমন দুর্ঘটনা সেই আনন্দকে মুহূর্তে বিষাদে পরিণত করে। এ বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে দায় নির্ধারণ এবং জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা ও মানবসম্পদ—সবদিকেই সমন্বিত সংস্কার প্রয়োজন।

Read full story at source